পল্লবীতে শিশু রামিসা হত্যা মামলায় ৫ দিনের মাথায় চার্জশিট পুলিশের
 

 

পল্লবীতে শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা: ঘাতক সোহেল ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল

রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রী ৮ বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় মূল ঘাতক সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেছে পুলিশ। এতে মূল আসামি সোহেল রানার বিরুদ্ধে সরাসরি ধর্ষণ ও পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে এই নৃশংস খুনে সরাসরি সহযোগিতা করার অভিযোগ আনা হয়েছে।

রোববার (২৪ মে ২০২৬) দুপুরে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে এই দুই আসামির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগপত্র জমা দেন। গত ১৯ মে (মঙ্গলবার) ঘটে যাওয়া এই রোমহর্ষক ঘটনার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় অত্যন্ত দ্রুততম সময়ে পুলিশ এই চার্জশিট প্রস্তুত ও দাখিল করল।

পৈশাচিক ঘটনার বিবরণ:

মামলার নথি ও তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, নিহত রামিসা স্থানীয় একটি স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ত। গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সে তাদের ফ্ল্যাটের ঘর থেকে বের হলে প্রতিবেশী ঘাতক সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার তাকে কৌশলে ফুঁসলিয়ে তাদের নিজেদের রুমের ভেতরে ডেকে নেয়।

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসার মা তাকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে ভবনের অন্য একটি ফ্ল্যাটের সামনে শিশুটির জুতা দেখতে পেয়ে তিনি সন্দেহবশত ডাকাডাকি করেন। ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে রামিসার বাবা-মা এবং ভবনের অন্যান্য বাসিন্দারা মিলে দরজার লক ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। শয়নকক্ষে ঢুকেই তারা মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন রক্তাক্ত মরদেহ দেখতে পান এবং মাথাটি রুমের ভেতরে একটি বড় বালতির মধ্যে রাখা অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।

উপস্থিত জনতা তৎক্ষণাৎ জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল দিলে পল্লবী থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে ঘাতকের স্ত্রী স্বপ্নাকে নিজেদের হেফাজতে নেয়। পরবর্তীতে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ঘটনার দিনই নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা থানা এলাকা থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় মূল ঘাতক সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় পুলিশ।

ইয়াবা সেবন ও আদালতে বিকৃত খুনের স্বীকারোক্তি:

নৃশংস এই ঘটনার পরদিন বুধবার (২০ মে) ভিকটিম শিশুটির বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। গ্রেপ্তারের পর ঘাতক সোহেল রানা আদালতে নিজের জঘন্য অপরাধ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। জবানবন্দিতে সে উল্লেখ করে, অপরাধটি সংঘটিত করার ঠিক আগে সে তীব্র মাত্রায় ইয়াবা ট্যাবলেট সেবন করেছিল।

সোহেল জানায়, ঘটনার দিন সকালে তার স্ত্রী স্বপ্না শিশুটিকে ঘরের ভেতর নিয়ে আসার পর সে রামিসাকে বাথরুমে নিয়ে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। পাশবিক নির্যাতনের কারণে শিশুটি জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। ঠিক ওই মূহুর্তে রামিসার মা বাইরে থেকে দরজায় কড়া নাড়তে থাকলে জানাজানি হওয়ার ভয়ে সোহেল ধারালো ছুরি দিয়ে রামিসার গলা কেটে হত্যা নিশ্চিত করে।

মরদেহ গুম ও সহজে লুকিয়ে ফেলার উদ্দেশ্যে সে ধারালো ছুরি দিয়ে মাথা কেটে শরীর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে এবং দুই হাত কাঁধ থেকে আংশিক বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এরপর বাথরুম থেকে খণ্ডিত দেহটি এনে শয়নকক্ষের খাটের নিচে লুকিয়ে রাখে। ইয়াবার করাল গ্রাসে বিকৃত যৌন লালসায় মত্ত হওয়া এই ঘাতক আরও জানায়, ভুক্তভোগী অবুঝ শিশু বা তার পরিবারের সঙ্গে তাদের পূর্ব কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিল না। পুরো পৈশাচিক ঘটনাটি যখন ঘটছিল, তখন তার স্ত্রী স্বপ্না একই ঘরে উপস্থিত থেকে তাকে সহযোগিতা করছিল এবং পরে জানালার গ্রিল কেটে সোহেল পালিয়ে যায়।

দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ তৈরি করা এই লোমহর্ষক মামলার চার্জশিট জমা হওয়ায় এখন দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিতের দাবি আরও জোরালো হয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top