দীর্ঘ কয়েক দশকের শীতলতা ও কূটনৈতিক অচলাবস্থা ভেঙে এক নতুন সামরিক ও কৌশলগত সমীকরণের দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্ক। সম্প্রতি পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে দুটি জেএফ-১৭ (JF-17) যুদ্ধবিমানের ‘সিমুলেটর’ বা অত্যাধুনিক প্রশিক্ষণ যন্ত্র হস্তান্তরের পর এই দ্বিপাক্ষিক সামরিক আলোচনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। আপাতদৃষ্টে এটি একটি সাধারণ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা মনে হলেও এর কৌশলগত ও প্রতীকী গুরুত্ব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী, যা প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের নীতিপ্রণেতাদের কপালে গভীর চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। কলকাতার প্রভাবশালী দৈনিক ‘টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া’ (The Telegraph India)-র এক বিশেষ বিশ্লেষণে এই ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
হাসিনা সরকারের পতন ও ঢাকার পররাষ্ট্রনীতির পুনর্বিন্যাস:
টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের পর ঢাকার পররাষ্ট্রনীতিতে এক বড় ধরনের গুণগত পরিবর্তন এসেছে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গঠিত নতুন প্রশাসন দিল্লির একক বলয় ও একপেশে প্রভাব থেকে বেরিয়ে এসে একটি স্বাধীন ও বহুমাত্রিক কূটনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করেছে। এর অংশ হিসেবেই ইসলামাবাদের সাথে দীর্ঘদিনের সংবেদনশীল ও অবরুদ্ধ যোগাযোগের পথগুলো পুনরায় উন্মুক্ত করা হচ্ছে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান ও চীনের যৌথ প্রযুক্তিতে তৈরি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমানের এই সিমুলেটর হস্তান্তর কেবল কোনো সাধারণ আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি মূলত বাংলাদেশি ক্রু ও বৈমানিকদের এই যুদ্ধবিমানের পরিচালন পরিবেশের সাথে অভ্যস্ত করার একটি সুনির্দিষ্ট ও কৌশলগত প্রয়াস।
প্রতিরক্ষা চুক্তি ও দিল্লির ভূ-রাজনৈতিক আতঙ্ক:
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম রয়টার্স এবং আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরু থেকেই পাকিস্তান বাংলাদেশের সাথে একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং জেএফ-১৭ ‘ব্লক-৩’ ভ্যারিয়েন্টের আধুনিক যুদ্ধবিমান বিক্রির বিষয়ে জোরালো আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। পশ্চিমা বা ইউরোপীয় ফাইটারগুলোর তুলনায় এই বিমানটি অত্যন্ত সাশ্রয়ী হওয়ায় চলমান অর্থনৈতিক সংস্কারের এই সময়ে ঢাকা এটিকে একটি জাদুকরী ও বাস্তবসম্মত বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করছে।
এই প্রতিরক্ষা ঘনিষ্ঠতা ভারতের নিরাপত্তা মহলকে তীব্রভাবে নাড়া দিয়েছে। ‘মিডল ইস্ট আই’-এর বরাতে জানা গেছে, ভারতের পূর্ব সীমান্তে এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ বা ‘চিকেনস নেক’-এর ঠিক পাশেই পাকিস্তানের এই সামরিক পদচিহ্ন ও উপস্থিতি স্পষ্ট হওয়াকে দিল্লি একটি বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে দেখছে। ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো একে চীনের ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ বা ভারতকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলার কৌশলের অংশ হিসেবে উগ্রভাবে প্রচার করছে।
কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বনাম বাস্তবতার চ্যালেঞ্জ:
তবে স্বাধীন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দিল্লির এই আতঙ্ক কিছুটা অতিরঞ্জিত। বাংলাদেশ আসলে ভারতের সাথে সম্পর্ক সম্পূর্ণ ছিন্ন করছে না, বরং বেইজিং ও ইসলামাবাদের সাথে সম্পর্কের বৈচিত্র্যকরণ ঘটিয়ে নিজের ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। তাছাড়া, বাংলাদেশের ফাইটার আধুনিকীকরণের মূল ভরসা এখনো চীন। ঢাকা প্রায় ২.২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ২০টি আধুনিক চীনা যুদ্ধবিমান কেনার প্রক্রিয়া চালাছে। ফলে পাকিস্তানের এই ভূমিকা মূলত চীনের সামরিক ইকোসিস্টেমের একটি কম সংবেদনশীল ‘মাধ্যম’ হিসেবে কাজ করছে।
আঞ্চলিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ দেড় দশক ধরে পূর্ববর্তী সরকারের একপেশে নীতি ঢাকাকে দিল্লির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল করে তুলেছিল, যা অভ্যন্তরীণভাবে তীব্র জন-অসন্তোষের জন্ম দেয়। বর্তমান প্রশাসন ও দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি—উভয়েই এটি স্পষ্ট করেছে যে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে। ইসলামাবাদের সাথে এই সামরিক পুনর্মিলন পরাশক্তিগুলোকে বার্তা দেয় যে বাংলাদেশ এখন আর কারো একক ‘কৌশলগত বলয়’ বা প্রভাব বলয়ের অংশ নয়।
তবে এই সম্পর্ক কতটা দীর্ঘমেয়াদি হবে, তা নিয়ে চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ভারতের সাথে বাংলাদেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন এবং বিশাল বাণিজ্য ও জ্বালানি নেটওয়ার্কের যে গভীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে, তা রাতারাতি এড়িয়ে যাওয়া ঢাকার পক্ষে অসম্ভব ও ঝুঁকিপূর্ণ। ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর কারণে বাংলাদেশ কোনো চরম ভারত-বিরোধী অবস্থান নেবে না। তবে পাকিস্তানের সাথে এই ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা সহযোগিতা প্রমাণ করে যে, দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে একক আধিপত্যের দিন ফুরিয়ে আসছে এবং ঢাকা এখন নিজের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সম্পূর্ণ স্বাধীন চাল চালতে প্রস্তুত।







