বাংলাদেশ থেকে পোল্যান্ডভিত্তিক ফ্যাশন রিটেইল জায়ান্ট এলপিপি (LPP)-র প্রায় ৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বকেয়া পণ্যমূল্য পরিশোধ না করে উল্টো নতুন ক্রয়াদেশ (অর্ডার) স্থগিত করার ঘোষণা কেন্দ্র করে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে দেশের পোশাক শিল্পে। বকেয়া অর্থ আদায়ে দ্রুত সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ না নিলে প্রতিষ্ঠানটিকে বাংলাদেশে ‘কালো তালিকাভুক্ত’ (Blacklist) করাসহ আন্তর্জাতিক ফোরামে পুরো বিষয়টি তুলে ধরার কঠোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন শিল্প উদ্যোক্তারা।
অর্ডার স্থগিতের চিঠি ও বাংলাদেশের রফতানিকারকদের প্রতিক্রিয়া
গত ৩০ জুলাই ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এলপিপি জানায়:
-
সোর্সিং কৌশল পুনর্মূল্যায়ন: বৈশ্বিক সোর্সিং পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনার অংশ হিসেবে আপাতত বাংলাদেশ থেকে নতুন আদেশ ও পণ্য উন্নয়ন স্থগিত রাখা হচ্ছে।
-
অন্যান্য দেশ মূল্যায়ন: তারা বর্তমানে বিকল্প অন্যান্য উৎপাদনকারী দেশের সক্ষমতা যাচাই-বাছাই করছে।
তবে বাংলাদেশি রফতানিকারকরা বলছেন, বিশ্ববাজারের কৌশল পরিবর্তনের চেয়ে পাওনা আদায়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কারণেই চাপ তৈরি করতে এলপিপি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন:
“এলপিপি আমাদের অন্যতম প্রধান ক্রেতা। পাওনা নিয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু হঠাৎ করে ব্যবসা স্থগিত করা একটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের দায়িত্বশীল আচরণ নয়। আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজাই উভয়ের জন্য শুভ।”
৪০ মিলিয়ন ডলার বিরোধের সূত্রপাত ও বর্তমান আইনি অবস্থা
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়াগামী সরাসরি ব্যবসায় আইনি জটিলতা তৈরি হলে এলপিপি ‘এফইএস রিটেইল’ (FES Retail) নামক মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে পোশাক সরবরাহ ও অর্থ প্রদানের ব্যবস্থা করে:
-
১৮ মাস বিল বন্ধ: প্রাথমিক অবস্থায় বিল পরিশোধ করা হলেও প্রায় ১৮ মাস ধরে কোনো অর্থ প্রদান করা হয়নি।
-
সম্পর্ক অস্বীকার: পরবর্তী সময়ে এলপিপি দাবি করে যে, এফইএস রিটেইলের সঙ্গে তাদের আনুষ্ঠানিক ব্যবসায়িক সম্পর্ক নেই।
-
ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান: এতে প্রায় ৪০টি কারখানা ও বায়িং হাউসের আনুমানিক ৪০ মিলিয়ন ডলার বকেয়া আটকা পড়ে। শেষপর্যন্ত কোনো উপায় না পেয়ে কারখানাগুলো আদালতের আশ্রয় নেয়।
ব্ল্যাকলিস্ট ও আন্তর্জাতিক ফোরামে যাওয়ার হুঁশিয়ারি
পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে কঠোর অবস্থানের কথা স্পষ্ট করেছেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম:
১. কালো তালিকাভুক্ত করা: বকেয়া না মেটালে এলপিপিকে বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে ব্ল্যাকলিস্ট করার প্রক্রিয়া শুরু হবে।
২. আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম: ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), আন্তর্জাতিক ক্রেতা ফোরাম এবং বৈশ্বিক সোর্সিং প্ল্যাটফর্মে এই ব্যবসায়িক নীতিহীনতার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরা হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশ গার্মেন্ট বায়িং হাউস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, এলপিপি বাংলাদেশ থেকে বছরে প্রায় ৭০ কোটি ডলারের পোশাক ক্রয় করে থাকে। ফলে এত বড় ক্রেতার সঙ্গে সম্পর্ক ঝুঁকিতে পড়ায় খাতসংশ্লিষ্ট অনেকের ব্যবসায়িক কার্যক্রম মারাত্মক সংকটে পড়েছে।







