পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং আন্দোলনরত হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ওপর পুলিশের বর্বর নির্যাতনের প্রতিবাদে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাসভবনের সামনে নজিরবিহীন অবস্থান ধর্মঘটে বসেছেন প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস ও ‘ইন্ডিয়া’ (INDIA) জোটের শীর্ষ নেতারা। সেখান থেকে লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী Vadra, কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে এবং সমাজবাদী পার্টির (SP) প্রধান অখিলেশ যাদবসহ বিরোধীদের বেশ কয়েকজন শীর্ষনেতাকে আটক করেছে দিল্লি পুলিশ।
আজ মঙ্গলবার (২১ জুলাই ২০২৬) বিকেলে নয়াদিল্লির ৭ লোক কল্যাণ মার্গে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের একেবারে সামনে আচমকা এই অবস্থান ধর্মঘটে বসেন বিরোধী নেতারা। স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টার দিকে দিল্লি পুলিশ বহু গাড়ি নিয়ে গিয়ে রাহুল গান্ধীসহ উপস্থিত নেতাদের বলপূর্বক আটক করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়।
হঠাৎ ঘেরাও: হতচকিত নিরাপত্তারক্ষীরা
কংগ্রেস ও বিরোধী নেতাদের এই আকস্মিক ও ঝটিকা পদক্ষেপে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এসপিজি (SPG) ও দিল্লি পুলিশ পুরোপুরি হতচকিত হয়ে পড়ে। খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে শত শত নেতাকর্মী ও শিক্ষার্থী লোক কল্যাণ মার্গে জমায়েত হতে থাকেন।
তারা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অবিলম্বে পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল স্লোগান দিতে থাকেন।
অবস্থান ধর্মঘটে অন্যান্যের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন:
-
মল্লিকার্জুন খাড়গে — সভাপতি, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস।
-
প্রিয়াঙ্কা গান্ধী — সাধারণ সম্পাদক, কংগ্রেস।
-
কে সি বেনুগোপাল — সাংগঠনিক সম্পাদক, কংগ্রেস।
-
অখিলেশ যাদব — প্রধান, সমাজবাদী পার্টি।
-
সুপ্রিয়া সুলে — নেত্রী, এনসিপি (NCP)।
-
ভি ডি সতীশন — প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা, কেরল।
-
ডি কে শিবকুমার — উপ-মুখ্যমন্ত্রী, কর্ণাটক।
-
যোগেন্দ্র যাদব — বিশিষ্ট রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনকর্মী।
“প্রধানমন্ত্রীর ঘুম ভাঙাতে এসেছি”: রাহুল গান্ধীর হুঁশিয়ারি
অবস্থান ধর্মঘটে বসার পরপরই বিকেল ৪টার দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ (সাবেক টুইটার) রাহুল গান্ধী লেখেন:
“আমরা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে চলে এসেছি। গতকাল নিরীহ ছাত্রদের ওপর পুলিশি অত্যাচারের জবাব চাইতে এসেছি। এই সরকার কোনো নৈতিক দায় নিতে চায় না, এমনকি সংসদে এটি নিয়ে গঠনমূলক বিতর্কও চায় না। দেশের লাখ লাখ যুব সম্প্রদায়ের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করার অপরাধে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অবিলম্বে পদত্যাগ করা উচিত।”
পরবর্তীতে সন্ধ্যা পৌনে ৬টায় দেওয়া আরেকটি বার্তায় তিনি দেশের আপামর দেশপ্রেমিক জনগণকে এই আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আকুল আহ্বান জানান।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, গতকাল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)-র ডাকে সারা দেশ থেকে আসা হাজার হাজার শিক্ষার্থী সংসদ অভিমুখে যাত্রা করলে পুলিশ তাদের ওপর বেপরোয়া লাঠিচার্জ ও হামলা চালায়। এই ইস্যুতে লোকসভায় স্পিকারের কাছে জরুরি আলোচনার দাবি জানান রাহুল গান্ধী। কিন্তু স্পিকার কোনো আশ্বাস না দেওয়ায় ক্ষুব্ধ রাহুল দলীয় আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশ্যে বলেন, “চলুন, আজ সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর ঘুম ভাঙাতে যাই।”
সরকারের মধ্যস্থতা প্রত্যাখ্যান ও অচলাবস্থা
কংগ্রেস নেতাদের ধরনার খবর পেয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের (PMO) দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব দ্রুত ঘটনাস্থলে যান। তারা রাহুল গান্ধীর সাথে কথা বলে ধরনা তুলে নেওয়ার অনুরোধ জানান এবং আগামী কাল (বুধবার) সংসদে বিষয়টি নিয়ে সরকার আলোচনায় প্রস্তুত বলে আশ্বাস দেন।
তবে কংগ্রেস সংসদ সদস্য সৈয়দ নাসির হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, “আমরা এই মৌখিক আশ্বাসে রাজি হইনি। নিট (NEET) ও অন্যান্য পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায় নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অবিলম্বে পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আমাদের এই প্রতিরোধ চলবে।”
অন্যদিকে বিজেপির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, বিরোধীরা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ঘেরাও করে সুরক্ষার মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করেছে। এই অভিযোগ খণ্ডন করে কংগ্রেস নেতা মনিক্কম টেগোর বলেন, “প্রধানমন্ত্রী সংসদে আসেন না, বিরোধীদের কথা শোনেন না। আমরা রাজপথে নামা ছাড়া আর কোথায় যাব?”
অবশেষে সন্ধ্যা ৭টার দিকে বিশাল পুলিশ বহর এসে আন্দোলনরত সব শীর্ষ নেতাদের চাড়াও করে পুলিশ ভ্যানে তুলে নিয়ে যায়। ঘটনার পর পুরো ৭ লোক কল্যাণ মার্গ ও আশপাশের পুরো এলাকাজুড়ে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং কড়া নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে।







