এলডিসি উত্তরণে সময় বাড়ানোর প্রস্তাবে পাশে থাকবে ইইউ ও জি-৭৭
 

 

এলডিসি উত্তরণে সময় বাড়ানোর যৌক্তিকতায় পাশে থাকার আশ্বাস ইইউ ও জি-৭৭-এর: জাতিসংঘে বাণিজ্যমন্ত্রীর ফলপ্রসূ বৈঠক

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের মসৃণ, টেকসই ও স্থায়ী উত্তরণ নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিকাল আরও ৩ বছর বাড়ানোর যৌক্তিকতাকে অত্যন্ত শক্তিশালী বলে মনে করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং গ্রুপ অব সেভেনটি সেভেন অ্যান্ড চায়না (জি-৭৭ ও চীন)। বাংলাদেশের এই ক্রান্তিকালে প্রয়োজনীয় সংস্কার কাজ সুসংহত করতে ঢাকা ও বৈশ্বিক ফোরামে পাশে থাকার দৃঢ় আশ্বাস দিয়েছে প্রভাবশালী এই দুই আন্তর্জাতিক জোট।

আজ শুক্রবার (১৭ জুলাই ২০২৬) ঢাকায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক জরুরি সরকারি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘ সদর দপ্তরে পৃথক দুটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বাংলাদেশকে এই আশ্বাস দেওয়া হয়।

জাতিসংঘে সফররত বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে পৃথকভাবে বৈঠকে বসেন জাতিসংঘে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রতিনিধিদলের প্রধান রাষ্ট্রদূত স্তাভরস লামব্রিনিদিস এবং জি-৭৭ ও চীনের বর্তমান চেয়ার ও জাতিসংঘে উরুগুয়ের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত লরা দুপুই লাসেরে।

বৈঠকে উপস্থিত বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল

জাতিসংঘ সদর দপ্তরের এই নীতি-নির্ধারণী বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে বাংলাদেশের পক্ষে অংশ নেন:

  • জোনায়েদ সাকি (মাননীয় পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী)

  • মো. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী (সচিব, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ – ERD)

  • রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী (জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি)

  • সৈয়দ নাসিম মনজুর (সভাপতি, ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ – LFMEAB)

  • মাহমুদ হাসান খান (সভাপতি, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন – BGMEA)

সময় বাড়ানোর পক্ষে বাণিজ্যমন্ত্রীর জোরালো যুক্তি

দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও ব্রিফিংয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এলডিসি থেকে চূড়ান্ত উত্তরণের জন্য নির্ধারিত প্রস্তুতিকাল আরও ৩ বছর বাড়ানোর স্বপক্ষে বাংলাদেশের বাস্তব পরিস্থিতি ও যৌক্তিকতা তুলে ধরেন।

বাণিজ্যমন্ত্রী বিশ্ব নেতৃবৃন্দের উদ্দেশ্যে বলেন:

“বাংলাদেশ এখন এক নজিরবিহীন ও ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও তীব্র জ্বালানি সংকটের মতো চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যেও আমাদের সরকার দেশীয় অর্থনীতিতে ব্যাপক কাঠামোগত ও পদ্ধতিগত সংস্কার কাজ শুরু করেছে। এই সুদূরপ্রসারী সংস্কারগুলোকে টেকসই ও সুসংহত করতে বাংলাদেশের জন্য কিছুটা বাড়তি সময় প্রয়োজন।”

তিনি সুশাসন জোরদার করা, দেশের আর্থিক খাতের আমূল উন্নয়ন, অবকাঠামো সম্প্রসারণ, দেশীয় সম্পদ আহরণ বাড়ানো এবং দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত ও বিনিয়োগবান্ধব ব্যবসায়িক পরিবেশ গড়ে তুলতে বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। মন্ত্রী দৃঢ়ভাবে বলেন, এই বাড়তি সময় পেলে দেশের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর হবে এবং বিশ্ববাজারে আমাদের রপ্তানিমুখী শিল্প খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বহুগুণ বাড়বে, যা বাংলাদেশের উত্তরণকে অপরিবর্তনীয় ও স্থায়ী করবে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জি-৭৭-এর ইতিবাচক সাড়া

বাংলাদেশের সংস্কার পরিকল্পনা ও এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতির বিষয়ে দুই প্রভাবশালী জোটের প্রতিনিধিরা গভীর সন্তোষ প্রকাশ করেন:

  • রাষ্ট্রদূত স্তাভরস লামব্রিনিদিস (ইইউ প্রতিনিধিদলের প্রধান): তিনি বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং টেকসই উন্নয়নের অঙ্গীকারের ভূয়সী প্রশংসা করেন। একই সাথে তিনি বাংলাদেশ-ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ / FTA) নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর বিষয়টিকে স্বাগত জানান। তিনি আশ্বাস দেন যে, বাংলাদেশ যাতে এলডিসি থেকে মসৃণভাবে বের হতে পারে, সে জন্য ইইউর বাণিজ্য সুবিধা ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত সহায়তা অব্যাহত থাকবে। এই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে সরকারি খাতের পাশাপাশি দেশের বেসরকারি খাতের সাথে নিবিড় অংশীদারিত্বের ওপর জোর দেন তিনি।

  • রাষ্ট্রদূত লরা দুপুই লাসেরে (জি-৭৭ ও চীনের চেয়ার): তিনি ৩ বছর সময় বৃদ্ধির দাবিতে বাংলাদেশের উত্থাপিত প্রতিটি যুক্তিকে অত্যন্ত ‘যৌক্তিক ও শক্তিশালী’ বলে অভিহিত করেন। তিনি সরকারের সামগ্রিক সংস্কার রোডম্যাপকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, বৈশ্বিক ফোরামে বাংলাদেশের এই প্রস্তাবের পক্ষে জি-৭৭ সর্বাত্মক সমর্থন দিয়ে যাবে। এই বিষয়ে আরও বৃহৎ পরিসরে সমর্থনের জন্য জি-৭৭ ভুক্ত দেশগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে বাংলাদেশের উত্তরণ কৌশলের ওপর জাতিসংঘে একটি বিশেষ ব্রিফিংয়ের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেন তিনি, যা বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল আনন্দের সাথে গ্রহণ করে।

“আলোচনা অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে” — ইআরডি সচিব

জাতিসংঘ সদর দপ্তরের বৈঠক শেষে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী ইইউ ও জি-৭৭-এর সাথে অনুষ্ঠিত আলোচনাকে দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ বলে বর্ণনা করেন।

তিনি জানান, বাংলাদেশের এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পরবর্তী সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় এবং একটি বৈষম্যহীন টেকসই বাজার নিশ্চিত করতে উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্থাসমূহ বাংলাদেশের পাশে রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top