“ঐতিহাসিক জুলাই সনদের প্রতিটি অক্ষর এই নির্বাচিত সরকারই অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, বিরোধী দল আজ শুধুমাত্র ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য এই পবিত্র ‘জুলাই বিপ্লব’ ও এর শহীদদের রক্তকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাচ্ছে। আমরা জুলাই আন্দোলনকে কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার আরেকটি সস্তা মই বা হাতিয়ারে পরিণত হতে দেব না।”
আজ শুক্রবার (১৭ জুলাই ২০২৬) দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে বরেণ্য শিক্ষাবিদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমদের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক স্মরণসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। প্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমদ রিসার্চ সেন্টার এবং বাংলাদেশ জাতীয় সাংবাদিক সমিতি যৌথভাবে এই স্মরণসভার আয়োজন করে।
“রাজপথে ফায়সালার হুমকির প্রয়োজন নেই, আমরা সনদে দায়বদ্ধ”
বিরোধী দল জাতীয় সংসদের ভেতরে ও বাইরে আন্দোলনের যে হুমকি দিচ্ছে, তার জবাবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বলেন:
“বিরোধী দল থেকে ইদানীং খুব চড়া সুরে বলা হচ্ছে— ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি এবং সংস্কার আদায় না হলে এবার রাজপথে ফায়সালা হবে’। আমি তাঁদের মনে করিয়ে দিতে চাই, জুলাই সনদে কিন্তু আমরা একসাথেই স্বাক্ষর করেছিলাম। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে যে দলগুলো রাজপথে ছিলাম, সবাই মিলেই সেখানে সই করেছি। আমরা তো বারবার বুক ফুলিয়ে বলছি, জুলাই সনদের প্রতিটি প্রতিশ্রুতি ও অক্ষর আমরাই বাস্তবায়ন করব। তাহলে এই রাজপথের কৃত্রিম হুমকির রহস্য কী?”
মির্জা ফখরুল বলেন, জুলাই সনদের মূল রূপরেখাটি মনোযোগ দিয়ে পড়লে স্পষ্ট দেখা যাবে, সেখানে পরিষ্কার বলা আছে— যে নির্বাচনী ম্যানিফেস্টো (ইশতেহার) দিয়ে দলগুলো জনগণের ভোটে নির্বাচিত হবে, বিজয়ী হয়ে প্রতিটি দল তাদের সেই নিজস্ব ম্যানিফেস্টোই বাস্তবায়ন করবে। আমরা বিএনপির পক্ষ থেকে যেমন ৩১ দফায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, ঠিক তেমনিভাবে জুলাই সনদেও সম্পূর্ণ দায়বদ্ধ। কিন্তু সেটি অবশ্যই আমরা যেভাবে চেয়েছি এবং দেশের মানুষ যেভাবে রায় দিয়েছে, সেভাবেই বাস্তবায়িত হবে। এখানে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সম্পূর্ণ ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে ছড়ানো হচ্ছে যে, বর্তমান সরকার নাকি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে চায় না।
গণভোট ও ‘জাতির সাথে প্রতারণা’ নিয়ে ভিন্ন সুর
সম্প্রতি আয়োজিত গণভোটের কিছু বিতর্কিত বিষয় নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে মন্ত্রী বলেন:
“গণভোটের একটি বিশেষ অংশ নিয়ে আমাদের দলের সাথে আগে কোনো আলোচনাই করা হয়নি। বিশেষ করে জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষে আনুপাতিক হারের প্রতিনিধিত্বের যে ধারণা বা ফর্মুলা, সেটির বিষয়ে আমরা কখনোই একমত হইনি। অথচ সেই বিতর্কিত বিষয়টিই সেখানে গোপনে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। সংস্কার কমিশন আমাদের সম্মতি ও মতামত ছাড়াই সেদিন যেভাবে তাড়াহুড়ো করে বিষয়গুলো চাপিয়ে দিয়েছিল, তা নিয়ে আমি নিজেই তখন আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে বলেছিলাম যে— এভাবে পর্দার আড়ালে জাতির সঙ্গে চরম প্রতারণা করা হচ্ছে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “এখন বিরোধী দলের অনেকে নানা মুখরোচক ও চটকদার কথা বলে সাধারণ মানুষকে উত্তেজিত করার অপচেষ্টা করছেন। বাংলার জনগণ কিন্তু অনেক সচেতন, তারা সবচেয়ে ভালো বোঝেন এবং সময়মতো সবচেয়ে সঠিক সিদ্ধান্তটি নিতে পারেন। আমরা শুরু থেকেই স্পষ্ট বলে এসেছি— আমরা বিদ্যমান সংবিধানের প্রয়োজনীয় ‘সংশোধন’ করতে চাই, কিন্তু পুরো সংবিধান ‘সংস্কার’ বা বদলে ফেলার কথা আমরা কখনোই বলিনি। এ দেশের জনগণ বিপুল ভোটে আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারকে জয়ী করেছে এবং দেশের ইতিহাসে ‘টু-থার্ড মেজরিটি’ (দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা) নিয়ে বিএনপি আজ রাষ্ট্র পরিচালনার পবিত্র দায়িত্ব পেয়েছে। ওই জায়গায় কোনো বিভ্রান্তির বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই।”
“জুলাই ১৮ বছরের লড়াইয়ের চূড়ান্ত পরিণতি”
জুলাই বিপ্লবের গভীরতার কথা উল্লেখ করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বলেন, “এই আন্দোলন কিন্তু হঠাৎ করে শুধু জুলাই মাসেই গড়ে ওঠেনি। জুলাই আন্দোলন হলো দীর্ঘকাল ধরে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এ দেশের ছাত্র-জনতা ও আমাদের প্রায় ১৮ বছর ধরে রাজপথে চলা রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের এক চূড়ান্ত ও ঐতিহাসিক পরিণতি।”
স্মরণসভায় মরহুম অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও তাঁর রূহের মাগফিরাত কামনা করে মির্জা ফখরুল বলেন, “মরহুম এমাজউদ্দীন স্যার ছিলেন আমাদের লিবারেল ডেমোক্রেসি বা উদারপন্থী গণতন্ত্রের এক অনন্য বাতিঘর। কোনো ধরনের ব্যক্তিগত প্রাপ্তি বা উচ্চাভিলাষের আশা ছাড়াই তিনি আজীবন গণতন্ত্র ও স্বৈরাচারবিরোধী লড়াইয়ে আমাদের সঠিক পথ দেখিয়েছেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে একটি ঐক্যবদ্ধ, বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হবে তাঁর প্রতি আমাদের দেওয়া শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধা।”
স্মরণসভায় বিশিষ্টজনদের উপস্থিতি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত স্মরণসভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন— ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ওবায়দুল ইসলাম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক কামরুল হাসান, প্রখ্যাত কবি ও দৈনিক যুগান্তর সম্পাদক আবদুল হাই শিকদার, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব জার্নালিস্টসের সভাপতি ও আমার দেশ-এর যুগ্ম সম্পাদক এম আবদুল্লাহ, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ এবং বিশিষ্ট শিল্পপতি ও সমাজসেবক আবুল কাশেম হায়দার প্রমুখ। অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সঞ্চালনা করেন প্রফেসর এমাজউদ্দীন রিসার্চ সেন্টারের আহ্বায়ক অধ্যাপক আবদুল লতিফ মাসুম।







