ডালহৌসি পাহাড় ও হিমালয় পাদদেশীয় ভারতের সিকিম-পশ্চিমবঙ্গে ভারী বৃষ্টিপাত এবং ভারতীয় কর্র্তৃপক্ষ গজলডোবা ব্যারাজের সবকটি গেট একযোগে খুলে দেওয়ায় ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমার ১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তীব্র গতিতে ধেয়ে আসা উজানের ঢল সামাল দিতে নীলফামারীর হাতীবান্ধায় অবস্থিত বাংলাদেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট (স্লুইস গেট) সার্বক্ষণিকভাবে সম্পূর্ণ খোলা রেখেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
আজ মঙ্গলবার (২৩ জুন ২০২৬) ভোর থেকে পানি হু হু করে বাড়তে থাকায় লালমনিরহাট, নীলফামারী ও রংপুরের তিস্তাপারের নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলগুলো প্লাবিত হতে শুরু করেছে। হঠাৎ এই বন্যা পরিস্থিতিতে নদীপাড়ের লাখো মানুষের মাঝে চরম আতঙ্ক ও চরম দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে।
৫ জেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, আবহাওয়া পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী আরও দুই থেকে তিন দিন দেশের উত্তরাঞ্চল ও ভারতের উজানে ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। এর ফলে উজান থেকে আসা ঢলের পরিমাণ আরও বাড়বে। তিস্তার পানি বৃদ্ধির ফলে আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে উত্তরবঙ্গের ৫টি জেলায় বন্যা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে:
-
লালমনিরহাট
-
রংপুর
-
নীলফামারী
-
গাইবান্ধা
-
কুড়িগ্রাম
“শুষ্ক মৌসুমে হাহাকার, বন্যায় আমাদের ভাসিয়ে দেয়”
তিস্তার ডালিয়া ও গড্ডিমারী চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের অভিযোগ, ভারত সরকারের এই একতরফা পানি নিয়ন্ত্রণ নীতি তাদের প্রতি বছরের অভিশাপ। হাতীবান্ধার উত্তর গড্ডিমারী গ্রামের সাবেক স্কুলশিক্ষক মহিরুদ্দিন নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে গণমাধ্যমকে বলেন:
“ভারত সরকার প্রতি বছর আমাদের সঙ্গে এই তামাশাটা করে। শুষ্ক মৌসুমে যখন আমাদের ফসলের জন্য পানির তীব্র হাহাকার থাকে, তখন তারা সব গেট বন্ধ করে আমাদের মরুভূমি বানিয়ে রাখে। আর বর্ষা মৌসুমে যখন আমাদের এক ফোঁটা অতিরিক্ত পানির প্রয়োজন নেই, তখন নিজেদের এলাকা বাঁচাতে গজলডোবা ব্যারাজের ৫৪টি গেট একযোগে খুলে দিয়ে আমাদের ঘরবাড়ি-ফসল ভাসিয়ে দেয়।”
একই এলাকার বাসিন্দা মোন্তাজ মিয়া জানান, তিস্তার তীরবর্তী এলাকার গ্রামীণ রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শত শত একর আমন ধানের বীজতলা ও সবজি খেত ইতিমধ্যেই পানির নিচে তলিয়ে গেছে। পানি যেভাবে বাড়ছে, তাতে যেকোনো সময় চর ও নদী তীরবর্তী গ্রামগুলো মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে।
সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে পানি উন্নয়ন বোর্ড
পানি উন্নয়ন বোর্ড লালমনিরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল কুমার বলেন, “ভারত থেকে ধেয়ে আসা উজানের ঢলে তিস্তা নদীর পানি মঙ্গলবার ভোর থেকে অস্বাভাবিক গতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে। তিস্তাপারের নিম্নাঞ্চলগুলো প্লাবিত হয়ে ইতিমধ্যে বন্যা দেখা দিয়েছে। আমরা প্লাবিত ও ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের সর্বস্তরের জনগণকে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য এবং সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছি।”
তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বিকেলে জানান, “আজ মঙ্গলবার বেলা ৩টায় পরিমাপ অনুযায়ী তিস্তার পানি বিপৎসীমা স্পর্শ করে আরও ১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যারাজের ৪৪টি গেটই খুলে রাখা হয়েছে। কোনো বাঁধ বা নদী রক্ষা রাস্তা যাতে ভেঙে না যায়, সেজন্য আমরা পাউবোর টিম নিয়ে মাঠ পর্যায়ে সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ঠিক এমন একটি ক্রান্তিকালেই চীনের বেইজিংয়ে বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের আসন্ন ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ (Teesta Mega Plan) সংক্রান্ত দ্বিপাক্ষিক আলোচনাটি উত্তরবঙ্গের কোটি মানুষের ভাগ্য নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।







