বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দুই দিনের সফল মালয়েশিয়া সফরকে কেন্দ্র করে একটি জমকালো ও আবেগঘন ভিডিও প্রকাশ করেছে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর (PMO)। ওয়ান ইন্ডিয়া বা বহুমাত্রিক কূটনৈতিক প্রচারণার অংশ হিসেবে তৈরি এই ভিডিওটির সবচেয়ে বড় চমক হলো—এতে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বা আবহ সংগীত হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বাংলাদেশের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী হাবিব ওয়াহিদ ও মেহরনিগরি রুস্তামের গাওয়া তুমুল জনপ্রিয় গান ‘মহাজাদু’।
মঙ্গলবার (২৩ জুন ২০২৬) বাংলাদেশ সময় সকাল ৯টার দিকে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়। পোস্ট করার মাত্র ৩ ঘণ্টার মধ্যেই ভিডিওটি ৯ লাখের বেশিবার দেখা (ভিউ) হয়েছে এবং বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার নেটিজেনদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
ভিডিওর অন্তর্নিহিত বিষয়: ‘আমার বন্ধু মহাজাদু জানে’
২ মিনিট ৪০ সেকেন্ডের এই বিশেষ ভিডিওটিতে দুই দেশের সরকারপ্রধানের একান্ত ও দ্বিপাক্ষিক বৈঠক, আনুষ্ঠানিক মধ্যাহ্নভোজ, বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক আয়োজনসহ সফরের নানা গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি ও মুহূর্ত অত্যন্ত নান্দনিকভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
পুরো ভিডিও জুড়েই আবহ সংগীত হিসেবে বাজতে থাকে ‘আমার বন্ধু মহাজাদু জানে’ গানটি। তবে ভিডিওর মাঝের অংশে একটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত তুলে ধরার সময় গানটির আওয়াজ কিছুটা কমিয়ে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বক্তব্য জুড়ে দেওয়া হয়।
রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে আনোয়ার ইব্রাহিমের প্রতিশ্রুতি
ফেসবুকে পোস্ট করা ওই ভিডিওতে আনোয়ার ইব্রাহিমকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে কথা বলতে শোনা যায়। তিনি বলেন:
“অবশ্যই, আমাদের যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশ এবং এখানে (মালয়েশিয়ায়) অবস্থানরত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দীর্ঘস্থায়ী সংকট সমাধানের সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। একই সঙ্গে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের কার্যালয় এবং আঞ্চলিক জোট আসিয়ানের (ASEAN) শক্তিশালী ফোরামের মাধ্যমে আমরা মিয়ানমার জান্তা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করব, যাতে এই মানবিক সমস্যার একটি আংশিক বা টেকসই সমাধান দ্রুত খুঁজে বের করা যায়।”
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর এই কূটনৈতিক বক্তব্য তুলে ধরার সময়ও ব্যাকগ্রাউন্ডে আবহ সঙ্গীত হিসেবে হালকা সুরে ‘মহাজাদু’ গানটি বাজতে দেখা যায়, যা দুই দেশের গভীর বন্ধুত্বকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
জিয়া পরিবারের সঙ্গে পুরনো সম্পর্কের স্মৃতিচারণ: ‘ভাই তারেক রহমান একজন যোদ্ধা’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠনের চার মাস পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এটিই ছিল প্রথম বিদেশ সফর। দুই দিনের এই ঐতিহাসিক সফর শেষে সোমবারই তিনি চীনের দালিয়ান শহরের উদ্দেশ্যে কুয়ালালামপুর ত্যাগ করেছেন।
এর আগে সোমবার মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক রাজধানী পুত্রাজায়ায় আয়োজিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে জিয়া পরিবারের সঙ্গে নিজের বহু বছরের পুরনো ও পারিবারিক সম্পর্কের কথা আবেগঘন কণ্ঠে তুলে ধরেন আনোয়ার ইব্রাহিম। তিনি বলেন:
“আমরা অত্যন্ত সৌভাগ্যবান যে, আপনার (তারেক রহমানের) প্রয়াত পিতা (শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান) এবং আপনার শ্রদ্ধেয় মাতার (বেগম খালেদা জিয়া) সঙ্গে আমাদের দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল। আমি আজ তারেক রহমানকে আমার জীবনের প্রথম অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছি—যখন আমি একজন তরুণ যুবনেতা ছিলাম, তখন বাংলাদেশের মৌচাক স্কাউট ক্যাম্পে তাঁর দূরদর্শী বাবার সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল।”
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আরও যোগ করেন, “আর আমি যখন মালয়েশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলাম, তখন বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও আপনার মাতার সঙ্গে বেশ কয়েকবার অত্যন্ত ফলপ্রসূ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে আমার দেখা হয়েছিল। তবে এর চেয়েও বড় সত্য কথা হলো—আমার ভাই তারেক রহমান এবং তাঁর পরিবার দীর্ঘ বছর ধরে চরম কষ্ট, রাজনৈতিক নিপীড়ন ও সংগ্রাম সহ্য করেছেন। তিনি নিজের দেশের মানুষকে গভীরভাবে ভালোবাসেন এবং তাদের স্বাধীনতা ও সার্বিক উন্নতির পক্ষে নিজের রাজনৈতিক আদর্শে সবসময় হিমালয়ের মতো অবিচল থেকেছেন।”
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় সফরের ভিডিওতে বাংলাদেশি গান ব্যবহার এবং সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ‘ভাই তারেক রহমান’ বলে সম্বোধন করা—বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ইতিহাসে এক নতুন ও অভূতপূর্ব অধ্যায়ের সূচনা করল।







