দেশের ব্যাংকিং খাতে এক বিশাল ও নজিরবিহীন ধাক্কা দিয়ে দেশের বৃহত্তম শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংক ‘ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি’-এর চেয়ারম্যানসহ পরিচালনা পর্ষদের (বোর্ড অব ডিরেক্টরস) সব সদস্যের নিয়োগ একযোগে বাতিল করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সাধারণ আমানতকারীদের আমানতের নিরাপত্তা ও সামগ্রিক জনস্বার্থ বিবেচনা করে আজ এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
রবিবার (১৪ জুন ২০২৬) বিকেলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, ‘ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১’-এর প্রদত্ত ক্ষমতাবলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই কঠোর ও বড় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
পর্ষদ বাতিল এবং নির্বাহী পরিচালকের হাতে সর্বময় ক্ষমতা
বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জারি করা একটি বিশেষ প্রজ্ঞাপন ও বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান এবং সমস্ত পরিচালকের নিয়োগ অবিলম্বে বাতিল করা হলো। একই সঙ্গে, দেশের বৃহত্তম এই ব্যাংকের দৈনন্দিন পরিচালনা ও তদারকি কার্যক্রমে যেন কোনো ধরনের অচলাবস্থা তৈরি না হয় এবং ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, সেজন্য একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
‘ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১’-এর ৪৭(৩) ধারা অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনকে ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদের সব ক্ষমতা প্রয়োগ এবং দায়িত্ব পালনের একক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, নতুন পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ বা বোর্ড গঠন না হওয়া পর্যন্ত তিনিই ব্যাংকের শীর্ষ অভিভাবক হিসেবে কাজ করবেন।
মূল উদ্দেশ্য: আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা ও সুশাসন
কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের বিজ্ঞপ্তিতে এই কঠোর সিদ্ধান্তের পেছনে তিনটি মূল কারণ উল্লেখ করেছে:
১. ব্যাংকটির ভেতরে ভেঙে পড়া সুশাসন (Governance) পুনরায় নিশ্চিত করা।
২. কোটি কোটি সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের আমানতের স্বার্থ শতভাগ সংরক্ষণ করা।
৩. দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং কার্যক্রমে স্থিতিশীলতা ও তারল্য বজায় রাখা।
ব্যাংক খাতে বড় তোলপাড় ও দখলদারিত্বের অবসান?
গত কয়েক বছর ধরেই ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ, বিতর্কিত এস আলম গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারি এবং ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে দেশজুড়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা ও তীব্র বিতর্ক চলছিল। গতকালও (শনিবার) চট্টগ্রামের এক জনসভায় বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ অভিযোগ করেছিলেন যে ইসলামী ব্যাংককে আবারও বিতর্কিত গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়ার বন্দোবস্ত চলছে।
এমন উত্তপ্ত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেই আজ রবিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের এই আকস্মিক ও কঠোর হস্তক্ষেপ দেশের আর্থিক খাতে এক ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক ও ব্যাংকিং বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরাসরি ইসলামী ব্যাংকের ওপর নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করল, যা ব্যাংকটির প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বড় ভূমিকা রাখবে।
তবে এই আদেশ জারির পর বাংলাদেশ ব্যাংক বা ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ ব্যবস্থাপনার পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে ক্যামেরার সামনে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।







