ইসলামী ব্যাংক ‘ইসলাম’ নয়, জামায়াতও ‘ইসলাম’ নয়- সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
 

 

ইসলামী ব্যাংক যেমন ইসলাম নয়, জামায়াতও তেমনি ইসলাম নয়: সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ

জাতীয় সংসদে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি নিয়ে অত্যন্ত কড়া ও বিস্ফোরক বক্তব্য দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি এই ব্যাংকটিকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের ধর্মীয় আবেগ ব্যবহার না করার জন্য সংশ্লিষ্ট মহলের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “ইসলামী ব্যাংক ‘ইসলাম’ নয়, জামায়াতে ইসলামীও ‘ইসলাম’ নয়। সুতরাং সবকিছুতে ইসলামের ওপর হাত দেবেন না—এই দোহাই দেওয়া কিন্তু ঠিক নয়।” তিনি আরও মন্তব্য করেন, “একবার আজান দিয়ে দখল করা ব্যাংক এখন বেদখল হয়ে যাচ্ছে, তার যে যাতনা হচ্ছে—সেটা তারা (জামায়াত) হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছেন।”

মঙ্গলবার (৯ জুন ২০২৬) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় (বাজেট) অধিবেশনের তৃতীয় দিনে ৬৮ বিধিতে দেওয়া ইসলামী ব্যাংক সংক্রান্ত বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের এক জরুরি নোটিশের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

পর্দার আড়ালে গ্রাহক সাজিয়ে আন্দোলনের অভিযোগ

সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, জামায়াতে ইসলামীর নেতারা আড়ালে বলছেন তারা ব্যাংকের মালিক নন, অথচ আবার বাইরে বলছেন ইসলামের ওপর হাত দেবেন না। তিনি সম্প্রতি জামায়াতের কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান নেতার সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত আলাপের সূত্র টেনে বলেন, “তারা আমাকে বলে দিচ্ছেন ইসলামের ওপর হাত দেবেন না। মাননীয় স্পিকার, আজান দিয়ে যে ব্যাংক দখল করা হয়েছিল, তার দখল চলে যাওয়ার যাতনা আমরা বুঝি। যারা পর্দার আড়ালে থেকে সাধারণ গ্রাহক সাজিয়ে রাস্তায় লোক নামিয়ে আন্দোলন করাচ্ছে, তাদের ভিডিও ফুটেজ ও রাজনৈতিক পরিচয় আমাদের কাছে আছে। নিরীহ গ্রাহকদের জোর করে বলানো হচ্ছে যে আপনার অ্যাকাউন্ট আছে, আপনি কথা বলেন।”

ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার ‘ডাকাতি করে কিনে নেওয়া হয়েছে’ বলে বিরোধী দলের উপনেতার করা বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য দেন। তিনি বলেন:

“ইবনে সিনার মাত্র ২ শতাংশ শেয়ার ছিল, যা তারা ব্লক মার্কেটে স্বাভাবিকের চেয়ে তিন গুণ বেশি দামে বিক্রি করেছে। এটা অন রেকর্ড। পাবলিক লিস্টেড কোম্পানির শেয়ার কীভাবে ব্লক মার্কেটে তিন গুণ দামে বিক্রি হয়?”

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণা দেন, বিরোধী দলের নোটিশে যেহেতু ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার বৈধ ও প্রকৃত মালিকদের কাছে ফেরত দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, তাই সরকার সেই বৈধ ও প্রকৃত শেয়ারহোল্ডারদের কাছেই মালিকানা ফেরত দেওয়ার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। একই সঙ্গে কারা কত শতাংশ শেয়ারের মালিক, তা জনসমক্ষে প্রকাশ করার জন্য তিনি অর্থমন্ত্রী ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের প্রতি অনুরোধ জানান।

“আগে আইন পরিবর্তন করেন, তারপর আলোচনায় আসেন”

ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ ও পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া নিয়ে বিরোধী দলের তোলা আইনি আপত্তির কড়া জবাব দেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের আর্থিক খাতের একমাত্র নিয়ন্ত্রক (রেগুলেটরি) কর্তৃপক্ষ। ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৫, ৪৬, ৪৭ ও ৪৯ ধারায় বাংলাদেশ ব্যাংককে জনস্বার্থ, আমানতকারীদের স্বার্থ এবং ব্যাংকের স্বার্থ রক্ষায় যেকোনো ব্যাংকের চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে পরিচালনা পর্ষদ পর্যন্ত অপসারণ এবং পর্ষদ বাতিল করার পূর্ণ আইনি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

তিনি বিরোধীদের উদ্দেশ্যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলেন, “আগে ব্যাংক কোম্পানি আইন পরিবর্তন করেন, তারপর আপনারা এই আলোচনায় আসেন। অন্যথায় রেগুলেটরি অথরিটি হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের স্বার্থে ও ব্যাংককে রক্ষা করার স্বার্থে তার নিজস্ব ক্ষমতাবলে যেকোনো কার্যক্রম চালু রাখবে।”

ভোটের আগে আরডিএস (RDS)-এর ১১ হাজার কোটি টাকা গায়েব ও অবৈধ ঋণের তদন্ত

ইসলামী ব্যাংকের বিখ্যাত ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প ‘পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প’ (RDS)-এর অর্থ বিতরণ নিয়ে বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, আরডিএস প্রকল্পে সাধারণত নারী গ্রাহকদের ৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়া হয়। কিন্তু গত ৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগে তড়িঘড়ি করে এই প্রকল্পে আরও ১১ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অভিযোগ:

“ভোটের আগে অনেক নারীকে ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে এবং নির্বাচনের পর আরও টাকা দেওয়ার প্রলোভন দেখানো হয়েছে। এই অতিরিক্ত ১১ হাজার কোটি টাকার এখন কোনো হদিস নেই, কোনো খতিয়ান নেই।”

তিনি আরও জানান, প্রধান কার্যালয়ের (হেড অফিস) কোনো অনুমোদন ছাড়াই নির্বাচনের আগে একটি বিশেষ গ্রুপকে এক রাতের মধ্যে ৪০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সোশ্যাল করপোরেট রেসপন্সিবিলিটির (CSR) তহবিলের টাকা দিয়ে ঢাকা থেকে কক্সবাজারের বিমানের টিকিট কাটার মতো বিলাসী অনিয়মও হয়েছে, যার প্রতিটির সুনির্দিষ্ট তদন্ত হবে।

নিয়মবহির্ভূতভাবে ৯ হাজার কর্মকর্তা ছাঁটাই ও দলীয়করণ

ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় নজিরবিহীন দলীয়করণের খতিয়ান তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “তকবির দিয়ে ব্যাংক দখল করার পর কোনো আইন-কানুন না মেনে সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূতভাবে ৯ হাজার কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ৬ হাজার নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়, যাদের সবাই একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের কর্মী বা সমর্থক। শুধু তাই নয়, যোগ্যতার তোয়াক্কা না করে ১৩ হাজার কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে অনেকে একযোগে ৩টি করে প্রমোশন পেয়েছেন, যা ব্যাংকিং ইতিহাসে অসম্ভব।”

বক্তব্যের শেষাংশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “এই সমস্ত অনিয়ম-দুর্নীতি তো ইসলামের নামেই করা হয়েছে বলে মনে হয়। সুতরাং এগুলো নিরপেক্ষ তদন্ত হলে হয়তোবা আমাদের চেনা অনেকের নামই থলের বেড়াল হয়ে সামনে চলে আসতে পারে।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top