আগামী অর্থবছরের বাজেটে সাধারণ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর স্বস্তি নিশ্চিত করতে ব্যক্তিগত করমুক্ত আয়সীমা বর্তমানের ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে একলাফে ৬ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। একই সাথে দেশের শিল্পায়ন ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিতে করপোরেট করহার গড়ে ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনার পাশাপাশি তামাক ও মাদকের ওপর উচ্চ করহার বহাল রাখার দাবি জানিয়েছে দলটি।
রোববার (২৪ মে ২০২৬) রাজধানীর পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) মিলনায়তনে আয়োজিত এক বাজেট বিষয়ক বিশেষ মতবিনিময় সভায় দলটির পক্ষ থেকে এই বিকল্প বাজেট ভাবনা ও সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়।
বাজেট দর্শন ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন:
সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ডিন অধ্যাপক এ কে এম ওয়ারেসুল করিম। তিনি উল্লেখ করেন, জামায়াতে ইসলামী কেবল বিশাল অঙ্কের ‘বড় বাজেটের’ প্রতিযোগিতায় না গিয়ে মানসম্মত ও দক্ষ ব্যয় ব্যবস্থাপনার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রবন্ধে সাফ জানানো হয়, সামষ্টিক অর্থনৈতিক সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং ‘জুলাই সনদ’ (জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল চেতনা) পূর্ণ বাস্তবায়ন ছাড়া রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও অদক্ষতা দূর করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
অর্থনীতিবিদ ও দলটির বক্তারা যুক্তি দেন, ঢালাওভাবে কর আহরণ বাড়ালে বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান সংকুচিত হয় এবং ব্যবসায়িক পরিচালনা ব্যয় বৃদ্ধি পায়। তাই কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর কৃত্রিম চেষ্টা না করে, করের হার কমিয়ে বরং করের আওতা (Tax Net) সম্প্রসারণের ওপর জোর দেওয়া উচিত। একই সাথে ব্যবসায়ীদের গলার কাঁটা হিসেবে পরিচিত অগ্রিম আয়করের (Advance Tax) সম্পূর্ণ অবসান দাবি করে দলটি।
সরকারি প্যাকেজ ও ফ্যামিলি কার্ডের সমালোচনা:
মতবিনিময় সভায় সরকারের ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার নতুন প্রণোদনা প্যাকেজ এবং নিম্নআয়ের চার কোটি পরিবারের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির তীব্র সমালোচনা করা হয়। মূল প্রবন্ধকার এ কে এম ওয়ারেসুল করিম বলেন, “বিগত আমলের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিলে এই বিপুল অঙ্কের প্রণোদনা ও কার্ড বিতরণ উদ্যোগের কার্যকারিতা, স্বচ্ছতা এবং প্রকৃত প্রয়োজনীয়তা নিয়ে গভীর প্রশ্ন রয়েছে।”
শোষণ ও লুটপাটের হাতিয়ার বনাম শিক্ষা-স্বাস্থ্য:
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “অতীতের সরকারগুলো বাজেটকে সাধারণ মানুষের কল্যাণে ব্যবহার না করে দলীয় শোষণ ও লুটপাটের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানের কোনো টেকসই উন্নয়ন হয়নি।” তিনি আসন্ন বাজেটে মানবসম্পদ উন্নয়নের লক্ষ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে বরাদ্দ ব্যাপক হারে বাড়ানোর দাবি জানান।
বিশ্বব্যাংকের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “বাংলাদেশ বর্তমানে শিক্ষাখাতে বিশ্বের সর্বনিম্ন বরাদ্দপ্রাপ্ত দেশগুলোর একটি, যা একটি স্বাধীন জাতির জন্য লজ্জাজনক। এই খাতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বাড়ালে তা দীর্ঘমেয়াদে দক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং দেশের রাজস্ব সক্ষমতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৃদ্ধি পাবে।”
সভাপতির বক্তব্যে দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ৪ কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার সরকারি পরিকল্পনা কতটা বাস্তবায়নযোগ্য—তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। তিনি যেকোনো মূল্যে এডিপি (ADP) ও সরকারি ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।







