ব্যাংক খাতে চরম অনিয়ম, ঋণ কেলেঙ্কারী ও তারল্য সংকটে ফেলা এস আলম গ্রুপসহ বিতর্কিত পুরোনো মালিকদের পুনরায় ব্যাংকের মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণে ফেরার আইনি পথ চিরতরে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এজন্য বহুল বিতর্কিত ‘ব্যাংক রেজুলেশন (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়ার নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে আইনটির বিতর্কিত ‘১৮(ক)’ ধারাটি বাতিল করা হচ্ছে।
আজ সোমবার (১০ আগস্ট ২০২৬) সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে এই সংশোধনীর অনুমোদন দেওয়া হয়। লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের ভেটিং সাপেক্ষে এটি আইন হিসেবে কার্যকর হবে।
যে কারণে বাতিল হচ্ছে ১৮(ক) ধারা
২০২৫ সালে জারি করা অধ্যাদেশ সংশোধন করে তৈরি ‘ব্যাংক রেজুলেশন আইন, ২০২৬’-এ যুক্ত করা ১৮(ক) ধারায় বলা হয়েছিল— কোনো দুর্বল ব্যাংক রেজুলেশন বা একীভূতকরণের (Merge) আওতায় গেলেও আগের বা নতুন বিনিয়োগকারী যদি আর্থিক সহায়তা ফেরত দেওয়া, মূলধন ঘাটতি পূরণ এবং সুশাসনের প্রতিশ্রুতি দেয়, তবে তাকে পুনরায় মালিকানা ও সম্পদ হস্তান্তরের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।
এই ধারা যুক্ত হওয়ার পর থেকেই অর্থনীতিবিদ, ব্যাংক খাত বিশেষজ্ঞ ও সম্পাদক পরিষদ উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিল। অভিযোগ ওঠে, এই ধারার আড়ালে মূলত এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা চার ব্যাংক (ফার্স্ট সিকিউরিটি, সোশ্যাল ইসলামী, ইউনিয়ন ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক) এবং নাসা গ্রুপের এক্সিম ব্যাংক একীভূত করে গঠিত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’-এ পুরোনো বিতর্কিত মালিকদের আবারও ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।
বাতিলের প্রধান কারণসমূহ:
১. সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা: ব্যাংক ধ্বংসের জন্য দায়ী গোষ্ঠীকেই আবার টাকা ঢেলে মালিকানা ফিরিয়ে দিলে ব্যাংকিং খাতে মারাত্মক ‘দায়মুক্তির সংস্কৃতি’ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি ছিল।
২. অর্থের রহস্যময় উৎস: অর্থনীতিবিদদের মতে, সংকটে ফেলা ব্যক্তিরা পুনরায় মূলধন জোগানোর জন্য অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে টাকা খাটাতে পারে, যা ব্যাংক খাতের ঝুঁকি দ্বিগুণ বাড়াত।
৩. আমানতকারীদের আস্থা বৃদ্ধি: একীভূত পাঁচ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা (মোট ঋণের ৭৯%)। এমন পরিস্থিতিতে পুরোনো মালিকদের ফেরার পথ বন্ধ করা আমানতকারীদের বার্তা দেওয়ার একমাত্র উপায়।
৪. অকার্যকরতা: সরকার ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ জানায়, ১৮(ক) ধারার শর্ত মেনে এ পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আবেদন করেনি, ফলে বাস্তবতার নিরিখে ধারাটি অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞ প্রতিক্রিয়া
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর সরকারের এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন:
“ব্যাংক কোম্পানি আইনে ১৮(ক) ধারা যুক্ত করার সিদ্ধান্তটিই সঠিক ছিল না। এটি বাতিলের মাধ্যমে ব্যাংক খাতে কিছুটা স্বস্তি ফিরবে। তবে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার যে ক্ষতি হয়ে গেছে, তা কাটিয়ে উঠতে কেবল এ ধারা বাতিল যথেষ্ট নয়—আমানতকারীদের আস্থা ফেরাতে সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা নিতে হবে।”







