ভারতের পররাষ্ট্র গোয়েন্দা সংস্থা ‘রিচার্স অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং’ (র)-এর প্রধান পরাগ জৈন চার সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল নিয়ে ঢাকায় পৌঁছেছেন। দিল্লিতে পলাতক শেখ হাসিনার ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলন ও বাংলাদেশবিরোধী বক্তব্যের জের ধরে যখন দুই দেশের মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনা চলছে, ঠিক সেই মুহূর্তে ‘র’ প্রধানের এই ঝটিকা সফর ঘিরে নানা রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণের সৃষ্টি হয়েছে।
রোববার এয়ার ইন্ডিয়ার একটি নিয়মিত ফ্লাইটে পরাগ জৈন তাঁর প্রতিনিধি দল নিয়ে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন।
সফরসঙ্গী ও গোপনীয়তার আবহ
কূটনৈতিক সূত্র জানায়, ভারতীয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এই বিশেষ সফরে ‘র’ প্রধান পরাগ জৈনের সঙ্গে রয়েছেন সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা:
-
অশ্বীন মুকুন্দ কোটনিস
-
রাহুল নেগি
-
শৈবাল রায় চৌধুরী
ঢাকায় আসার আগে পরাগ জৈন চীন সফর শেষ করেছিলেন বলে খবর পাওয়া গেছে। প্রতিনিধি দলটি বর্তমানে ঢাকার একটি অভিজাত হোটেলে অবস্থান করছে। সফরে তারা বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট শীর্ষ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করবেন বলে জানা গেলেও, সফর ও আলোচ্যসূচি নিয়ে ঢাকা বা দিল্লির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি।
সফরের টাইমিং ও ঐতিহাসিক অভিযোগের পটভূমি
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই সফরটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে:
শেখ হাসিনা ও আসামিদের ভারতে অবস্থান: ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনা ও ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরিফ ওসমান বিন হাদী হত্যাকাণ্ডে জড়িত পলাতক আসামিরা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। ঢাকার তরফ থেকে আনুষ্ঠানিক আপত্তি সত্ত্বেও দিল্লিতে বসে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশবিরোধী বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ায় ক্ষুব্ধ বাংলাদেশের জনগণ ও অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা।
বিগত আমলের নানা অভিযোগ: বাংলাদেশের সাবেক নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন—২০০৯ সালের পিলখানা বিডিআর হত্যাকাণ্ড, ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনা, আয়নাঘর পরিচালনা এবং গুম-খুনের পেছনে ‘র’-এর তৎকালীন প্রত্যক্ষ সহায়তার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামে কেএনএফ, জেএসএস ও ইউপিডিএফ-এর সশস্ত্র তৎপরতার নেপথ্যে ভারতীয় সহায়তার প্রসঙ্গটি নিয়ে দেশের নিরাপত্তা মহলে আলোচনা রয়েছে।
নিরাপত্তা ও সামরিক বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন
সফরটি নিয়ে দেশের শীর্ষ সামরিক ও গোয়েন্দা বিশ্লেষকরা সতর্ক অবস্থান নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন:
-
সামরিক বিশেষজ্ঞ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোস্তফা কামাল বলেন, “’র’ প্রধানের বাংলাদেশ সফরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ। আমাদের দেশীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর উচিত তিনি কোথায় যাচ্ছেন, কাদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করছেন এবং আলোচ্য বিষয় কী—তা নিখুঁতভাবে মনিটরিং করা।”
-
গোয়েন্দা সূত্রের বক্তব্য: নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশের এক শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, ফ্যাসিবাদী শাসন টিকিয়ে রাখতে ভারতের ভূমিকার পটভূমিতে এবং পাহাড়ি এলাকার সাম্প্রতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ঢাকার প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
কূটনৈতিক একটি পক্ষের দাবি—বিগত কয়েক মাসের টানাপোড়েন শেষে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দ্বি-পাক্ষিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক স্বাভাবিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার একটি কূটনৈতিক প্রয়াস হিসেবেই এই সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে।







