দেশের ফ্রিল্যান্সার, ই-কমার্স উদ্যোক্তা ও বৈশ্বিক লেনদেনকারীদের দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান পেপল (PayPal) ও পেওনিয়ারের (Payoneer) মতো জনপ্রিয় পেমেন্ট ব্যবস্থা চালুর পথ উন্মুক্ত করল বাংলাদেশ ব্যাংক।
এ লক্ষ্যে দেশে প্রথমবারের মতো আন্তসীমান্ত বা ‘ক্রসবর্ডার ডিজিটাল পেমেন্ট’ প্রক্রিয়াকরণে একটি যুগান্তকারী ‘ব্যাংক-মধ্যস্থতাকারী কাঠামো’ (Bank-Intermediated Framework) প্রবর্তন করা হয়েছে। এর ফলে এখন থেকে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো পেপল ও পেওনিয়ারের মতো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করে সরাসরি সেবা চালু করতে পারবে।
আজ বুধবার (২৯ জুলাই ২০২৬) বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগ থেকে এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
কীভাবে কাজ করবে এই পেমেন্ট ব্যবস্থা?
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশিকা অনুযায়ী, লেনদেন পরিচালনা ও নিরাপত্তার জন্য নতুন একটি হিসাব ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে:
-
ডিজিটাল ভ্যালু অ্যাকাউন্ট (DVA): ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের নামে ডিজিটাল ওয়ালেট বা স্টোরড-ভ্যালু অ্যাকাউন্ট খোলার সুবিধা দেবে, যা ‘ডিজিটাল ভ্যালু অ্যাকাউন্ট (DVA)’ নামে পরিচিত হবে।
-
মাস্টার ডিভিএ ও সেটেলমেন্ট: গ্রাহকদের ব্যক্তিগত এসব হিসাব স্বয়ংক্রিয় বা আলাদাভাবে পরিচালিত না হয়ে প্রতিটি হিসাব সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের অধীনে রাখা একটি ‘মাস্টার ডিভিএ’ (Master DVA) বা সেটেলমেন্ট অ্যাকাউন্টের সঙ্গে যুক্ত থাকবে।
-
স্বচ্ছতা ও মনিটরিং: লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে রিয়েল-টাইম মনিটরিং এবং ব্যাংকের সিস্টেমে একটি সমান্তরাল খতিয়ান রাখা বাধ্যতামূলক। অব্যবহৃত কোনো তহবিল থাকলে তা ব্যাংকের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং নিয়মানুযায়ী তা সামঞ্জস্য করা হবে।
কারা এবং কী কী কাজে সেবাটি ব্যবহার করতে পারবেন?
নতুন এই কাঠামোর আওতায় ব্যক্তিপর্যায়ের পাশাপাশি ব্যবসায়ী, ফ্রিল্যান্সার এবং প্রবাসীরা বৈদেশিক মুদ্রায় তাৎক্ষণিক লেনদেনের সুবিধা পাবেন:
-
ব্যক্তিগত ও ভ্রমণ কোটা: চিকিৎসা, শিক্ষা, দাপ্তরিক বা ব্যক্তিগত ভ্রমণের ট্রাভেল কোটার আওতায় এই ওয়ালেট ব্যবহার করা যাবে।
-
ছোট কেনাকাটা ও ফি পরিশোধ: আন্তর্জাতিক অনলাইন কেনাকাটা বা ফি পরিশোধের ক্ষেত্রে প্রতি লেনদেনে সর্বোচ্চ ৩০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত ব্যয় করা যাবে।
-
অন্যান্য সুবিধা: আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্যপদ ফি, আইটিসংক্রান্ত খরচ, ভিসা প্রসেসিং ফি এবং অনলাইনে আন্তর্জাতিক হোটেল বুকিংয়ের ক্ষেত্রে এই ডিজিটাল ওয়ালেট ব্যবহার করা যাবে।
-
ই-কমার্স ও ফ্রিল্যান্সারদের আয় রূপান্তর: ফ্রিল্যান্সার এবং ই-কমার্স ব্যবসায়ীরা বিদেশে কাজ করে অর্জিত অর্থ মুহূর্তেই দেশে এনে ক্যাশ আউট করতে পারবেন। এছাড়া Export Retention Quota (ERQ) হিসাবধারী প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ তিনজন শীর্ষ কর্মকর্তা ব্যবসায়িক প্রয়োজনে এই DVA অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতে পারবেন।
-
বিদেশি পর্যটকদের সুবিধা: বাংলাদেশে আসা বিদেশি নাগরিক বা পর্যটকেরাও দেশের মার্চেন্ট পয়েন্টে তাৎক্ষণিক কেনাকাটা বা বিল পরিশোধের জন্য এই সুবিধা পাবেন।
নিরাপত্তা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন বাধ্যবাধকতা
আন্তর্জাতিক এই পেমেন্ট সেবা চালু করার আগে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে তাদের কারিগরি সক্ষমতা, নেটওয়ার্ক অবকাঠামো এবং সাইবার নিরাপত্তা ফ্রেমওয়ার্ক বিস্তারিত তুলে ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগ থেকে পূর্বানুমতি বা অনাপত্তি সনদ গ্রহণ করতে হবে।
পাশাপাশি মানি লন্ডারিং (অর্থ পাচার) প্রতিরোধ আইন ও গ্রাহক যাচাই (KYC) নীতি মেনে নিয়মিত লেনদেনের বিস্তারিত প্রতিবেদন কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দেওয়ার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।







