বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে- প্রধানমন্ত্রী
 

 

“কাউকে আলাদা মনে করি না, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে”: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

“একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়তে দেশের সকল নাগরিককে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। যার যার অবস্থান থেকে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের এখনকার অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধটা অনেক বড়। এখানে টিকে থাকতে হলে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি প্রত্যাশিত বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে হলে আমাদের জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।”

আজ বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই ২০২৬) দুপুরে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের জনপ্রশাসন সভা কক্ষে সমতলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রতিনিধি দলের সাথে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব কথা বলেন।

বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব মো. সুজাউদ্দৌলা (সুজন মাহমুদ) সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের ৮ দফা দাবি

উপ-প্রেস সচিব জানান, দেশের ১৭টি জেলার ১৮টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর একটি শীর্ষ প্রতিনিধি দল প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করেন। অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে প্রতিনিধিরা তাঁদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত নানা সমস্যা ও বঞ্চনার কথা প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করেন। প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত অধীর আগ্রহ ও মনোযোগ দিয়ে তাঁদের প্রতিটি বক্তব্য শোনেন।

বৈঠকে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রধান ৮টি দাবি সংবলিত স্মারকলিপি দেওয়া হয়। দাবিগুলো হলো:

১. সমতলের জন্য ভূমি কমিশন: সমতলে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের ভূমির মালিকানা সংক্রান্ত জটিলতা ও বিরোধ নিরসনে একটি বিশেষ ‘ভূমি কমিশন’ গঠন করা।

২. জাতীয় কনভেনশন: আদিবাসী ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন ও দাবিদাওয়া নিয়ে একটি জাতীয় কনভেনশনের আয়োজন করা।

৩. গোত্রভিত্তিক পরিচয়: সরকারি নথিপত্রে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ শব্দের পরিবর্তে প্রত্যেকের নিজস্ব গোত্রভিত্তিক সুনির্দিষ্ট পরিচয় প্রদান করা।

৪. সাংবিধানিক স্বীকৃতি: আদিবাসী হিসেবে সংবিধানে তাদের ঐতিহাসিক ও আইনি স্বীকৃতি নিশ্চিত করা।

৫. কেন্দ্রীয় কালচারাল সেন্টার: ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে একটি কেন্দ্রীয় কালচারাল সেন্টার স্থাপন করা।

৬. উচ্ছেদ বন্ধ করা: বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের নামে অথবা রিজার্ভ ফরেস্ট (সংরক্ষিত বনাঞ্চল) ঘোষণার অজুহাতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বসতি ও জমি থেকে তাদের উচ্ছেদ করা অনতিবিলম্বে বন্ধ করা।

৭. ঋণ সুবিধা: সমতলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার জন্য সহজ শর্তে বিশেষ সরকারি ঋণ সুবিধা প্রদান করা।

৮. বৈষম্যহীন অংশগ্রহণ: রাষ্ট্রের সকল স্তরে সমান সুযোগ ও অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা।

“প্রতি বছর ১৬ বিলিয়ন ডলার পাচার না হলে আপনাদের সব সমস্যার সমাধান হতো”

প্রতিনিধিদের দাবির প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন:

“ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী এ দেশের কোনো বিচ্ছিন্ন অংশ নয়, বরং তারা আমাদের প্রিয় জন্মভূমির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। আমরা এমন একটা বৈষম্যহীন দেশ গড়ে তুলতে কাজ করছি যেখানে কোনো বর্ণ, ধর্ম বা জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে কোনো দেয়াল থাকবে না। আমি বা আমার সরকার আপনাদের কাউকে আলাদা মনে করি না। সবাইকে সাথে নিয়েই আমরা সামনে এগোতে চাই।”

দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমাদেরকে অত্যন্ত ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক এক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার দেশের সব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং অর্থনীতিকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়ে গেছে। বিগত ১৭ বছর প্রতি বছর গড়ে এ দেশ থেকে ১৬ বিলিয়ন (১ হাজার ৬০০ কোটি) মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার করা হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ যদি পাচার না হতো, তবে আজ আপনাদের (ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী) এই মৌলিক সমস্যাগুলো অনেক আগেই সমাধান করে ফেলা সম্ভব হতো।”

তিনি আরও বলেন, “আগে শুধু টেলিভিশনের পর্দায় আর ব্যানারে উন্নয়নের রঙিন গল্প শুনতাম। কিন্তু বাস্তবে সেসব গল্প আসলে কোথায় গেল? এখন সব দেনা ও সংস্কারের বিশাল চাপ এসে পড়েছে আমাদের এই নির্বাচিত সরকারের ওপর। এই সরকারের ওপর জনগণের প্রত্যাশাও আকাশচুম্বী। আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি সেই খাদের কিনারা থেকে দেশকে টেনে তুলে ঘুরিয়ে দাঁড় করাতে। আমাদের সরকার অত্যন্ত আন্তরিক এবং পর্যায়ক্রমে যেগুলো দ্রুত সমাধানযোগ্য, সেগুলো আগে সমাধান করার চেষ্টা করছে।”

উচ্ছেদ বন্ধ ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন প্রসঙ্গে

সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান এবং বিএনপি সরকারের গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার ধারাবাহিকতা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “ফ্যাসিস্টরা এ দেশের একটা গোটা প্রজন্মকে ধ্বংস করে দিয়ে গেছে। তৃণমূলের মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের যাত্রা শুরু করেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তাঁর সময়ে ৩১ শয্যার হাসপাতাল স্থাপিত হয়েছিল। পরবর্তীতে আমাদের সরকার যখনই ক্ষমতায় এসেছে, সেটির মানোন্নয়ন করেছে। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতায় আসার পর তা ৫০ শয্যায় উন্নীত করেছিলেন। আর বর্তমান বাস্তবতায় আমাদের সরকার সেগুলোকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।”

বিগত সরকারের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আগের স্বৈরাচারী সরকার ইউনিয়ন ভিত্তিক যে কমিউনিটি স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো প্রতিষ্ঠা করার গালভরা প্রচার চালিয়েছিল, বাস্তবে সেগুলোর কোনো কার্যকারিতাই নেই; চিকিৎসাও নেই, ওষুধও নেই।”

তিনি আরও জানান, আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থ বছরে জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করা হবে। একই সাথে দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসার সুবিধার্থে কিডনি ডায়ালাইসিস ও হার্টের রিং প্রভৃতি জরুরি ও জীবন রক্ষাকারী মেডিকেল যন্ত্রাংশের ওপর আরোপিত সকল অতিরিক্ত কর বা শুল্ক হ্রাস করার কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

বৈঠকে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গ

উক্ত উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার, বিশিষ্ট সংসদ সদস্য আন্না মিনজ এবং দেশের প্রখ্যাত আদিবাসী অধিকার ও সংস্কৃতি কর্মী সঞ্জিব দ্রংসহ দেশের বিভিন্ন জেলার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top