মুজিববর্ষের নামে ৪৩টি মন্ত্রণালয় ৯৮২ কোটি টাকা অপচয় করেছে
 

 

সংসদে মেগা তথ্য: মুজিববর্ষের নামে অপচয় ৯৮২ কোটি টাকা, শেখ হাসিনার এক বছরের ‘খাবার বিল’ ৩৫ কোটি!

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তথাকথিত ‘মুজিববর্ষ’ উদযাপন উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি, ভাস্কর্য, বেদি, প্রতিকৃতি এবং ডিজিটাল সময় গণনার (কাউন্টডাউন) বোর্ড নির্মাণে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে মোট ৯৮২ কোটি ৯১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। একই সাথে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত এক বছরের খাওয়া-দাওয়া ও আপ্যায়ন বাবদ সরকারি তহবিল থেকে খরচ দেখানো হয়েছে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা

রোববার (১২ জুলাই ২০২৬) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলালের এক তীক্ষ্ণ প্রশ্নের জবাবে বর্তমান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংসদকে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আজকের প্রশ্নোত্তর পর্বে এই হিসাব সরকারিভাবে নথিবদ্ধ করা হয়।

৪৩ মন্ত্রণালয় মিলে লুটেছে অর্থ, শীর্ষে স্থানীয় সরকার বিভাগ

অর্থমন্ত্রী সংসদকে জানান, দেশের মোট ৬২টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে ৪৩টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বাজেট বরাদ্দ থেকে এই মুজিববর্ষের ব্যয়ের নামে অর্থ ওড়ানো হয়েছিল। অর্থমন্ত্রীর দেওয়া সরকারি তথ্য অনুযায়ী শীর্ষ ব্যয়কারী খাতসমূহ নিচে দেওয়া হলো:

মন্ত্রণালয় ও বিভাগ ব্যয়ের পরিমাণ (টাকায়)
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় (সর্বোচ্চ) ২৮৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা
রেলপথ মন্ত্রণালয় ২০৬ কোটি ৭৩ লাখ ৭১ হাজার টাকা
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ১৪০ কোটি ৪৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ১৩৩ কোটি ০৩ লাখ ২০ হাজার টাকা
স্বাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৪৭ কোটি ৬৬ লাখ ৫৬ হাজার টাকা
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ২৬ কোটি ২৬ লাখ ৪১ হাজার টাকা
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ২৪ কোটি ৩০ লাখ ৪৩ হাজার টাকা
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ ২৩ কোটি ২০ হাজার টাকা
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (ICT) বিভাগ ২০ কোটি ৪৯ লাখ ২০ হাজার টাকা

ভীমরতি ও ব্যয়ের অডিট নিয়ে সম্পূরক প্রশ্ন, অর্থমন্ত্রীর জবাব

জামায়াত সমর্থিত সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল তাঁর সম্পূরক প্রশ্নে অর্থমন্ত্রীর কাছে জানতে চান—বিপুল পরিমাণ এই সরকারি অর্থের কোনো অডিট বা বিশেষ উচ্চপর্যায়ের তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না এবং জনগণের ট্যাক্সের টাকা অপচয়কারী ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না। একই সাথে তিনি ভবিষ্যতে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক প্রচারণায় এ ধরনের মেগা অপচয় বন্ধে স্থায়ী আইন করার দাবি জানান।

জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন:

“মুজিববর্ষের এই বিশাল ব্যয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ নিরীক্ষা বা তদন্তের বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে আগের সরকারের সময় বিভিন্ন খাতে ব্যয়ের আরও অনেক বড় বড় অনিয়ম রয়েছে। আমাদের অন্তর্বর্তীকালীন ও বর্তমান সরকার পর্যায়ক্রমে সেগুলোর নিখুঁত হিসাব যাচাই করছে। এই যাচাই-বাছাই বা ‘স্টক চেকিং’ (Stock Checking) শেষেই প্রয়োজনীয় কড়া আইনি সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”

সাবেক প্রধানমন্ত্রীর খাওয়া-দাওয়ার খরচ প্রসঙ্গে ক্ষোভ প্রকাশ করে অর্থমন্ত্রী বলেন:

“এটা তো শুধু মুজিববর্ষের খতিয়ান। এছাড়া স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রীর (শেখ হাসিনার) কেবল এক বছরের খাওয়া-দাওয়ায় খরচ দেখানো হয়েছে ৩৫ কোটি টাকা! বিষয়টি শুধু একটি খাতে সীমাবদ্ধ নয়; এ ধরনের আরও অনেক অবিশ্বাস্য ও বিলাসী ব্যয় রয়েছে। আমরা সবগুলোর বিষয়ে ক্রমান্বয়ে হিসাব মেলাচ্ছি, যা পরে দেশবাসীকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।”

“টাকা পাচারকারীদের সঙ্গে বিএনপি ও এই সরকার কোনো আপস করবে না”

এদিকে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার এক জোরালো প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী দেশের অর্থনৈতিক অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, জনগণের রক্ত চুষে অর্থ লুট করে যারা বিদেশে পাচার করেছে, তাদের বিরুদ্ধে সরকারের আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা অত্যন্ত জোরালোভাবে অব্যাহত থাকবে এবং এক্ষেত্রে কোনো ধরনের রাজনৈতিক আপস করা হবে না।

অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন:

“দেশের সম্পদ লুট করে যারা বিদেশে পালিয়ে গেছে, তাদের সঙ্গে আমাদের দল বিএনপি কোনো আপস করবে না এবং এই নির্বাচিত সরকারও কোনো নরম নীতি দেখাবে না। অভিযুক্ত অনেকের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে মানি লন্ডারিং মামলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক তদন্ত চলছে এবং অনেকের দেশীয় সম্পত্তি জব্দের (Forfeiture) আইনি প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। এই চিরুনি অভিযান চলতেই থাকবে।”

মাহবুবুর রহমান বেলাল এমপির অপর এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী সংসদকে অবহিত করেন যে, সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত তিনটি ‘লাইন অব ক্রেডিট’ (LoC) ঋণচুক্তির আওতায় বর্তমানে দেশে মোট সাতটি উন্নয়ন প্রকল্প চলমান রয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top