সংসদে প্রবীণ রাজনীতিবিদ ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের প্রতি শ্রদ্ধা
 

 

সংসদে প্রয়াত প্রবীণ রাজনীতিবিদ ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের প্রতি শ্রদ্ধা: সংসদ ভবন প্রাঙ্গণেই হবে দাফন

সাবেক স্পিকার, সাবেক ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ও দেশের প্রবীণতম আইনজীবী ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারকে সততা, প্রজ্ঞা, রাজনৈতিক শিষ্টাচার এবং সংসদীয় গণতন্ত্রের এক উজ্জ্বল বাতিঘর হিসেবে স্মরণ করেছে জাতীয় সংসদ। শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দলের শীর্ষ নেতারা তাঁকে একজন সফল আইনজীবী, আপাদমস্তক ভদ্রলোক, প্রজ্ঞাবান সংসদীয় ব্যক্তিত্ব এবং আদর্শিক রাজনীতির এক নিবেদিতপ্রাণ নেতা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

রোববার (১২ জুলাই ২০২৬) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় তথা প্রথম বাজেট অধিবেশনের ২৩তম কার্যদিবসে তাঁর মৃত্যুতে আনা সর্বসম্মত শোক প্রস্তাবের ওপর এই আবেগঘন আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে বিকেল ৩টায় সংসদের বৈঠক শুরু হলে দিনের অন্য সব কার্যসূচি স্থগিত রেখে এই প্রবীণ নেতার বর্ণাঢ্য জীবনীর ওপর আলোকপাত করা হয়।

ভোরে প্রয়াণ, চিরতরে সংসদের আঙিনায় থাকার সিদ্ধান্ত

সংসদীয় প্রথা ও ঐতিহ্য অনুযায়ী, সাবেক এই স্পিকার ও রাষ্ট্রপ্রধানকে চিরনিদ্রায় শায়িত করার জন্য শেরেবাংলা নগরস্থ জাতীয় সংসদ ভবন প্রাঙ্গণকেই নির্ধারণ করা হয়েছে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন:

“ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ছিলেন সততা ও পেশাগত সুনামের এক অনন্য ও দুর্লভ উদাহরণ। দীর্ঘ অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময়ের আইনজীবী জীবনে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যক্তি, মক্কেল বা সহকর্মীর কাছ থেকে সামান্যতম কোনো অভিযোগ কখনো শোনা যায়নি। প্রথা অনুযায়ী সংসদ ভবন প্রাঙ্গণেই তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হবে। ফলে শারীরিকভাবে তিনি না থাকলেও আমাদের এই সংসদের সঙ্গেই তিনি চিরকালের জন্য থেকে যাবেন।”

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর পোশাক ও ব্যক্তিত্বের স্মৃতিচারণ করে রসাত্মকভাবে বলেন, “তিনি ছিলেন আপাদমস্তক একজন নিখুঁত ভদ্রলোক। তাঁকে প্রায় সবসময়ই চেনা থ্রি-পিস স্যুটে দেখা যেত, যা তাঁর ব্যক্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিল। একবার তাঁর নিজ এলাকার (পঞ্চগড়) একজন সাধারণ ভোটার তাঁকে ব্যতিক্রমীভাবে পায়জামা-পাঞ্জাবি পরা অবস্থায় দেখে চিনতেই পারেননি! তিনি সংসদের স্ট্যান্ডিং কমিটির অন্যতম জ্যেষ্ঠ সদস্য ছিলেন। এবার বার্ধক্যের কারণে নিজে নির্বাচন না করে তাঁর যোগ্য সন্তান ব্যারিস্টার নওশাদ জমিরকে মনোনয়ন দেওয়ার জন্য দলের কাছে অনুরোধ করেছিলেন।”

“ফ্যাসিবাদী আমলে বিনা পারিশ্রমিকে লড়েছেন” — বিরোধীদলীয় নেতা

সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের আইনি ও মানবিক উদারতার কথা গভীর কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করেন। তিনি বলেন:

“বিগত ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচারী শাসনামলে আমাদের হাজার হাজার রাজনৈতিক নেতাকর্মী যখন অবর্ণনীয় আইনি জটিলতা ও মিথ্যা মামলায় পড়তেন, তখন এই প্রবীণ মানুষটি বারবার আদালতে আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। দিনের পর দিন উচ্চ আদালতে আইনি লড়াই লড়েছেন, কিন্তু কখনো কোনো পারিশ্রমিক বা ফি নেননি। আমরা যখনই ফি দিতে চেয়েছি, তিনি বলতেন— স্বৈরাচারবিরোধী লড়াইয়ে শামিল হওয়া তাঁর নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব। এই মহান ঋণের বোঝা শোধ করার ক্ষমতা আমাদের নেই।”

মেধা ও যোগ্যতায় গড়া ‘সেলফ-মেড ম্যান’

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী এবং বিএনপির অন্যতম শীর্ষ নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারকে একজন সার্থক ‘সেলফ-মেড ম্যান’ (নিজের চেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত মানুষ) হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, সম্পূর্ণ নিজের মেধা, প্রজ্ঞা ও অদম্য যোগ্যতাবলে তিনি দেশের একাধিক সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে (ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও স্পিকার) অত্যন্ত সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি তাঁর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে কখনো কোনো নির্বাচনে পরাজিত হননি এবং শেষ দিন পর্যন্ত বহুদলীয় গণতন্ত্র ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতি অবিচল ছিলেন।

প্রবীণ রাজনীতিবিদ ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে তাঁর চিরচেনা রূপের স্মৃতিচারণ করে বলেন, “ঢাকা হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টে দূর থেকে মাথায় হ্যাট, গায়ে কোট এবং হাতে ছাতা নিয়ে কাউকে হাঁটতে দেখলেই আইন অঙ্গনের সবাই একবাক্যে বুঝে যেতেন—তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার।”

সংসদে এক মিনিট নীরবতা ও বিশেষ মোনাজাত

আলোচনা শেষে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, জাতি আজ একজন সত্যিকার অর্থে মহান রাজনীতিক ও আপাদমস্তক সাদা মনের মানুষকে হারাল। স্পিকার হিসেবে তিনি যে নিরপেক্ষতা ও দক্ষতার সাথে সংসদ পরিচালনা করেছিলেন, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।

সংসদে এ সময় আরও বক্তব্য দেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, এনসিপির আখতার হোসেন এবং জামায়াতের নাজিবুর রহমান। আলোচনা সমাপ্ত হওয়ার পর মরহুমের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে সংসদ কক্ষের সকল সদস্য আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন। পরে তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত ও জান্নাতুল ফেরদৌস কামনা করে সংসদে এক বিশেষ ও আবেগঘন মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) স্থায়ী কমিটির অন্যতম জ্যেষ্ঠ সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার আজ রোববার (১২ জুলাই ২০২৬) ভোর ৪টা ১৫ মিনিটে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top