জুলাই গণঅভ্যুত্থানে কওমি শিক্ষার্থীদের ভূমিকার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি
 

 

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে কওমি শিক্ষার্থীদের ভূমিকার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি মাওলানা জামিল সিদ্দিকীর

২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে কওমি মাদরাসার সর্বস্তরের শিক্ষার্থীদের যে অদম্য, সাহসী ও আত্মত্যাগী ভূমিকা ছিল, তার আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ কওমি ছাত্র ফোরাম।

শনিবার (৪ জুলাই ২০২৬) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে (পূর্বতন বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র) আয়োজিত ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলন-২০২৬’-এ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে অত্যন্ত আবেগময় বক্তৃতাকালে সংগঠনের সভাপতি মাওলানা জামিল সিদ্দিকী সরকারের কাছে এই জোর দাবি জানান।

‘বিপদগ্রস্ত আন্দোলনকারীদের আশ্রয়স্থল ছিল মসজিদ-মাদরাসা’

সম্মেলনে জুলাই আন্দোলনের দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে মাওলানা জামিল সিদ্দিকী বলেন, “২০২৪ সালের জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে যখন সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর রাষ্ট্রীয় বর্বরতা নেমে আসে, তখন কওমি মাদরাসার ছাত্ররা ঘরে বসে না থেকে সরাসরি রাজপথে রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানে সম্পৃক্ত হন। শুধু রাজপথেই লড়াই নয়, উত্তাল ও ভয়াবহ সেই সময়ে পুলিশ ও হেলিকপটার থেকে ছোঁড়া গুলির মুখে জীবন বাঁচাতে বিপদগ্রস্ত হওয়া শত শত সাধারণ আন্দোলনকারীকে নিজ বুকে এবং মসজিদ-মাদরাসায় নিরাপদ আশ্রয় দিয়েছিলেন কওমি ছাত্র ও আলেমরা।”

তিনি আরও জানান, ফ্যাসিবাদের কারফিউ ও আক্রমণ উপেক্ষা করে তাঁদের সংগঠন সে সময় আন্দোলনে বুলেটবিদ্ধ ও আহত হওয়া অসংখ্য মানুষের জন্য গোপনে খাবার ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবার সুব্যবস্থা নিশ্চিত করেছিল।

যাত্রাবাড়ী পয়েন্টের নৃশংসতা ও ৭৯ জন মাদরাসা ছাত্রের শাহাদাত

আন্দোলনের অন্যতম প্রধান রক্তাক্ত রণক্ষেত্র রাজধানীর যাত্রাবাড়ী পয়েন্টের কথা উল্লেখ করে জামিল সিদ্দিকী বলেন, “যাত্রাবাড়ী বিশ্বরোড ও সংলগ্ন এলাকায় ফ্যাসিবাদের পতন নিশ্চিত করতে যাত্রাবাড়ী মাদরাসাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়েছিলেন। এতে বহু ছাত্র গুরুতর আহত ও পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন।”

তিনি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের দিকে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ‘তরুণ আলেম প্রজন্ম’ নামের একটি প্ল্যাটফর্ম ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসেই শহীদদের যে প্রাথমিক খসড়া তালিকা প্রকাশ করেছিল, সেখানে দেখা গেছে আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ৭৯ জন মাদরাসা ছাত্র বুকে গুলি খেয়ে শাহাদাত বরণ করেছেন।

‘বৈষম্যহীন বাংলাদেশে কওমি ছাত্রদের সমান মূল্যায়ন চাই’

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে কওমি ছাত্রদের এসব ঐতিহাসিক অবদানের কথা সবিস্তারে তুলে ধরে বাংলাদেশ কওমি ছাত্র ফোরামের সভাপতি বলেন:

“এই সম্মেলন থেকে আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিনীত আহ্বান জানাব— যে বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে ছাত্র-জনতা রক্ত দিয়েছে, সেই বাংলাদেশে কওমি মাদরাসার ছাত্রদেরকেও মেধার ভিত্তিতে গুরুত্ব দেওয়া হোক। মুক্তিযুদ্ধে যেমন সর্বস্তরের মানুষের অবদান ছিল, তেমনি এই দ্বিতীয় স্বাধীনতায় কওমিদের যে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল, রাষ্ট্রকে অবশ্যই তার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে হবে। রাষ্ট্রের প্রতিটি জায়গায় তাঁদেরকে সমান সুযোগ দিয়ে মূল্যায়ন করা হোক।”

মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন সরকারের শীর্ষ মন্ত্রী ও নীতিনির্ধারকেরা

প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমানের প্রধান আতিথ্যে আয়োজিত এই ঐতিহাসিক ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলন-২০২৬’-এ সরকারের প্রায় পুরো নীতিনির্ধারক টিম উপস্থিত ছিল। অনুষ্ঠানে দেশের সামগ্রিক সংস্কার, জুলাইয়ের চেতনা রক্ষা এবং শহীদ পরিবারের পুনর্বাসন নিয়ে আরও বক্তব্য রাখেন:

  • স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ।

  • মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান।

  • আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।

  • গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন।

  • মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন এবং

  • প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ জাতীয় নেতৃবৃন্দ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার শীর্ষ সদস্যদের উপস্থিতিতে কওমি ছাত্র নেতার এই যৌক্তিক দাবি বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশে কওমি ধারার শিক্ষার্থীদের মূলধারার অর্থনীতি ও প্রশাসনে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top