ইসলামী ব্যাংকে লুটপাট বন্ধে কঠোর নজরদারির নির্দেশ গভর্নরের
 

 

ইসলামী ব্যাংকে লুটপাট বন্ধে কঠোর নজরদারির নির্দেশ গভর্নরের: ‘রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের আভাস পেলেই জানাবেন’

রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের নামে ইসলামী ধারায় পরিচালিত দেশের শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকগুলোতে যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো ধরনের লুটপাট বা জালিয়াতি না হতে পারে, সেদিকে কঠোর নজরদারি বাড়ানোর জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানদের সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান।

শনিবার (৪ জুলাই ২০২৬) বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ইসলামিক ব্যাংকস রেগুলেশন অ্যান্ড পলিসি ডিপার্টমেন্টের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই কড়া নির্দেশনা দেন।

মিরপুরে বিআইবিএম মিলনায়তনে ‘ইসলামিক ব্যাংকিং কার্যক্রমে পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানের শরিয়াহসংক্রান্ত ভূমিকাবিষয়ক’ এই বিশেষ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।

গ্রাহকদের বিশ্বাসের সাথে প্রতারণা করা হয়েছে

কর্মশালায় গভর্নর মোস্তাকুর রহমান দেশের ইসলামী ব্যাংকিং খাতের সংকট ও এর পেছনের মূল কারণ তুলে ধরে বলেন:

“বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ প্রথাগত ব্যাংকিংয়ের চেয়ে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি অনেক বেশি বিশ্বস্ত। যে কারণে তাঁরা নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থ বা আমানত ইসলামী ব্যাংকগুলোতেই বেশি জমা রাখেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক যে, বিগত বছরগুলোতে কতিপয় গোষ্ঠীর রাজনৈতিক চাপের কারণে সাধারণ মানুষের এই পবিত্র বিশ্বাসের সঙ্গে চরম প্রতারণা করা হয়েছে। তাদের আমানতের টাকা নামে-বেনামে লুটপাট করা হয়েছে।”

তিনি আরও যোগ করেন, “রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের নামে আগে শরিয়াহ ব্যাংকগুলোতে যেভাবে আমানতকারীদের অর্থ লুটপাট করা হয়েছে তা আর্থিক খাতের ইতিহাসে নজিরবিহীন। এই একক কারণে পুরো ব্যাংক খাতে এক বড় ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বর্তমানে বহুমুখী কঠোর ও সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে।”

রাজনৈতিক চাপ এলেই কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানানোর নির্দেশ

ভবিষ্যতে ইসলামী ব্যাংকগুলোতে সুশাসন বজায় রাখা এবং রাজনৈতিক চাপমুক্ত রাখার ওপর জোর দিয়ে গভর্নর ব্যাংকগুলোর চেয়ারম্যানদের আশ্বস্ত করে বলেন, “ভবিষ্যতে এই ব্যাংকগুলোতে যাতে আর কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ঘটনা না ঘটে এবং কোনো ধরনের লুটপাট না হয়, সেদিকে পরিচালনা পর্ষদকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। যদি কোনো মহল থেকে কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বা অনৈতিক সুবিধার আভাস পাওয়া যায়, তবে তা তাৎক্ষণিকভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অবহিত করবেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজ দায়িত্বে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে সেটি শক্ত হাতে মোকাবিলা করবে।”

উপস্থিত ছিলেন খাতের শীর্ষ নীতিনির্ধারকেরা

বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই কর্মশালায় দেশের শরিয়াহভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ ব্যাংক, শরিয়াহ উইন্ডো এবং শরিয়াহ শাখা রয়েছে এমন সকল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানরা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে খাতের সংস্কার ও শরিয়াহ পরিপালন নিয়ে আরও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন— বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহমেদ এবং ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার। এছাড়া অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বিআইবিএমের পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আশরাফুল আলমসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বিআইবিএমের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী ব্যাংকগুলোর চেয়ারম্যানদের উপস্থিতিতে গভর্নরের এই কড়া বার্তা ও অভয়বাণী দেশের শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং খাতের ওপর সাধারণ আমানতকারীদের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনতে অন্যতম বড় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top