কড়া অভিবাসন নীতি ও গণ-নির্বাসনের (Mass Deportation) মহাপরিকল্পনা নিয়ে দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউজে বসা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও এক বিশাল আইনি ও সাংবিধানিক ধাক্কা খেলেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘ ১৬০ বছর ধরে প্রচলিত ‘জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব’ (Birthright Citizenship) বাতিলের বিষয়ে ট্রাম্পের দেওয়া বহুল বিতর্কিত নির্বাহী আদেশটি (Executive Order) সম্পূর্ণ অবৈধ ঘোষণা করে তা বাতিল করে দিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট।
আদালত অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে জন্ম নেওয়া প্রত্যেকটি শিশুর নাগরিকত্ব পাওয়ার অলঙ্ঘনীয় সাংবিধানিক অধিকার পূর্ণ শক্তিতে বহাল থাকবে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএন (CNN) আজ এই ঐতিহাসিক রায়ের খবরটি নিশ্চিত করেছে।
“নাগরিকত্ব হলো সব অধিকার পাওয়ার অধিকার” — প্রধান বিচারপতি
যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস রায়ের মূল পর্যবেক্ষণে এক যুগান্তকারী ও আবেগঘন বক্তব্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন:
“নাগরিকত্ব কেবল কোনো সাধারণ আইনি তকমা নয়; নাগরিকত্ব হলো ‘সব অধিকার পাওয়ার মূল অধিকার’। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ঐতিহাসিক ১৪তম সংশোধনীর (14th Amendment) প্রণেতারা এই মার্কিন ভূখণ্ডে স্বাধীনভাবে জন্ম নেওয়া প্রত্যেকটি ব্যক্তির জন্য নিঃশর্ত নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন। মার্কিন বিচার বিভাগ আজও সেই পবিত্র অঙ্গীকার অক্ষুণ্ন রাখছে।”
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর মাধ্যমে নিশ্চিত করা এই জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের নীতির কারণে এত দিন ধরে আমেরিকার মাটিতে যেকোনো দেশের বা যেকোনো আইনি মর্যাদার বাবা-মায়ের সন্তান জন্ম নিলেই সে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মার্কিন গ্রিন কার্ড ও পাসপোর্টের (নাগরিকত্ব) অধিকারী হতো। ট্রাম্প তাঁর নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে মূলত অনথিভুক্ত বা অবৈধ অভিবাসীদের সন্তানদের এই অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
অনিশ্চয়তা থেকে বাঁচল লাখ লাখ শিশু: কমবে অনথিভুক্ত মানুষের সংখ্যা
আইনি ও জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞদের মতে, সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের ফলে আগামী কয়েক দশকে যুক্তরাষ্ট্রে অনথিভুক্ত বা অবৈধ মানুষের সংখ্যা আশংকাজনক হারে বেড়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেল।
যদি ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশটি সুপ্রিম কোর্টে বৈধতা পেয়ে যেত, তবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত লাখ লাখ অনথিভুক্ত অভিবাসী বাবা-মায়ের ঘরে জন্ম নেওয়া নিষ্পাপ শিশুরা জন্ম থেকেই ‘রাষ্ট্রহীন’ (Stateless) বা অবৈধ বাসিন্দা হিসেবে চিহ্নিত হতো। এতে আমেরিকার ভেতরেই এক বিশাল জনগোষ্ঠী মৌলিক ও মানবিক অধিকার বঞ্চিত হয়ে এক চরম মানবিক সংকটের মুখোমুখি হতো। আদালতের এই ঐতিহাসিক রায়ের ফলে সেই দীর্ঘমেয়াদি সংকট কেটে গেল।
কড়া অভিবাসন নীতির দেওয়ালে বড় ফাটল
গত কয়েক দিন ধরে হাইতি ও সিরিয়ার টিপিএস (অস্থায়ী সুরক্ষা মর্যাদা) বাতিলসহ একের পর এক অভিবাসনবিরোধী মামলায় সুপ্রিম কোর্টে ট্রাম্প প্রশাসন জয়লাভ করলেও, জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের মতো আমেরিকার মূল ভিত্তিগত ও সাংবিধানিক প্রশ্নে সর্বোচ্চ আদালত ট্রাম্পের মুখের ওপর কড়া জবাব দিলেন। এই রায়কে মার্কিন ডেমোক্র্যাট, মানবাধিকার সংগঠন এবং অভিবাসী অধিকার রক্ষা কমিটিগুলো আমেরিকার উদারনৈতিক মূল্যবোধ ও সংবিধানের এক বিশাল বিজয় হিসেবে উদযাপন করছে।







