২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান চলাকালে কুষ্টিয়ায় নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ছয়জনকে হত্যা, আন্দোলনকারীদের ‘জঙ্গি’ আখ্যা দিয়ে সর্বোচ্চ বলপ্রয়োগের উসকানি এবং তৎকালীন স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারকে ‘শ্যুট অ্যাট সাইট’ (দেখামাত্র গুলি) নীতি বাস্তবায়নে সরাসরি প্ররোচনা দেওয়ার মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
মঙ্গলবার (৩০ জুন ২০২৬) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল জনাকীর্ণ আদালতে ২১১ পৃষ্ঠার এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। রায়ের পুরো কার্যক্রম সরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ‘বাংলাদেশ টেলিভিশন’ (বিটিভি)-এ সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
কাঠগড়ায় ইনু: রায়ের বিবরণ
মঙ্গলবার দুপুর ১টা ৪২ মিনিটে মামলার একমাত্র আসামি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে কড়া নিরাপত্তায় ট্রাইব্যুনালের হাজতখানা থেকে এজলাসকক্ষের কাঠগড়ায় তোলা হয়। এর ঠিক ১০ মিনিট পর রায় পড়া শুরু হয়।
ট্রাইব্যুনাল-২ এর দ্বিতীয় সদস্য বিচারক শাহরিয়ার কবীর আসামির বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনা সুনির্দিষ্ট ৮টি গুরুতর অভিযোগ পড়ে শোনান। এরপর প্রথম সদস্য মঞ্জুরুল বাছিদ সাক্ষীদের জবানবন্দি ও নথিপত্রের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন। সবশেষে প্যানেলের চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী জাসদ সভাপতির উপস্থিতিতে সাজা ঘোষণা করেন।
তদন্ত থেকে রায়: মামলার দীর্ঘ পরিক্রমা
প্রসিকিউশনের দেওয়া নথিমুক্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করে।
-
২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫: ট্রাইব্যুনালে ফরমাল চার্জ (আনুষ্ঠানিক অভিযোগ) দাখিল।
-
২ নভেম্বর ২০২৫: সুনির্দিষ্ট ৮টি অভিযোগে চার্জ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু।
-
১ ডিসেম্বর ২০২৫: সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু। প্রসিকিউশনের পক্ষে তদন্ত কর্মকর্তাসহ ১০ জন এবং আসামিপক্ষে ২ জন সাফাই সাক্ষী দেন।
-
২ এপ্রিল থেকে ১৪ মে ২০২৬: উভয় পক্ষের দীর্ঘ যুক্তিতর্ক (Arguments) উপস্থাপন শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (CAV) রাখা হয়।
-
৩০ জুন ২০২৬: চূড়ান্ত রায় ঘোষণা।
প্রমাণিত হওয়া ৮টি সুনির্দিষ্ট অপরাধের খতিয়ান
আদালতে হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে আনা প্রসিকিউশনের আটটি অভিযোগেরই সত্যতা নিখুঁতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। রায়ে উলেখ করা প্রধান অপরাধগুলো হলো:
১. আন্তর্জাতিক মাধ্যমে উসকানি: ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ভারতের মুম্বাইভিত্তিক টেলিভিশন ‘মিরর নাউ’-এ দেওয়া এক লাইভ সাক্ষাৎকারে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ‘বিএনপি-জামায়াত, সন্ত্রাসী ও উগ্রপন্থী জঙ্গি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের দমনে সর্বোচ্চ বলপ্রয়োগের উসকানি দেন ইনু।
২. ‘শ্যুট অ্যাট সাইট’ নীতি অনুমোদন: ১৯ জুলাই গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে আয়োজিত ১৪ দলীয় জোটের নীতি নির্ধারণী বৈঠকে অংশ নিয়ে নিরীহ ও নিরস্ত্র ছাত্র-জনতাকে দমনে ‘দেখামাত্র গুলি’ করার গণহত্যার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
৩. কুষ্টিয়ায় গণহত্যার ফোন কল: ২০ জুলাই দুপুরে নিজ জেলা কুষ্টিয়ার তৎকালীন পুলিশ সুপারকে (এসপি) ফোন করে আন্দোলনকারীদের ছবি দেখে তালিকা করার এবং কঠোর অ্যাকশন নেওয়ার নির্দেশ দেন। এর জের ধরে ৫ আগস্ট পর্যন্ত কুষ্টিয়া শহরে পুলিশ ও ১৪ দলের ক্যাডারদের গুলিতে শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী ও চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ নিহত হন।
৪. মারণাস্ত্র ব্যবহার ও কারফিউ সমর্থন: জুলাই আন্দোলন দমনে ছত্রীসেনা নামানো, হেলিকপ্টার থেকে স্নাইপার দিয়ে গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড ও বোম্বিংয়ের মাধ্যমে গণহত্যা এবং নির্যাতনকে রাজনৈতিকভাবে বৈধতা দেন ইনু। ২৯ জুলাইয়ের বৈঠকে জামায়াতকে নিষিদ্ধের প্রস্তাব দিয়ে রাষ্ট্রীয় দমনপীড়নকে উসকে দেন তিনি।
৫. শেষ মুহূর্তের খুনের অনুমোদন: শেখ হাসিনা সরকার পতনের ঠিক আগের দিন অর্থাৎ ৪ আগস্ট নতুন করে কারফিউ জারি এবং দেখামাত্র গুলির নির্দেশনাসহ শেখ হাসিনার সব অপরাধমূলক পদক্ষেপের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেন এই জাসদ নেতা।
রায়ের পর্যবেক্ষণে ট্রাইব্যুনাল উল্লেখ করেন, হাসানুল হক ইনু সরাসরি নিজে অস্ত্র হাতে গুলি না চালালেও, স্বৈরাচারী নীতিনির্ধারণী ফোরামের অন্যতম শীর্ষ সহযোগী হিসেবে তাঁর উসকানি, প্ররোচনা এবং পরিকল্পনা মাঠপর্যায়ে সাধারণ নাগরিকদের ওপর মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনে অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।






