দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের তিস্তা অববাহিকার প্রায় দুই কোটি মানুষের যুগান্তকারী ভাগ্যবদলে বড় ঘোষণা দিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যেই বহুল প্রতীক্ষিত ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’র (Teesta Mega Plan) ফিজিবিলিটি স্টাডি বা সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের চূড়ান্ত কাজ সম্পন্ন করে তা দ্রুত বাস্তবায়নের মেগা উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সাথে দেশের এক-তৃতীয়াংশ তথা প্রায় সাত কোটি মানুষের পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘পদ্মা ব্যারেজ’ প্রকল্পের টেন্ডার বা দরপত্র প্রক্রিয়া খুব শিগগিরই শুরু হতে যাচ্ছে।
রোববার (২৮ জুন ২০২৬) জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী এই যুগান্তকারী আশাবাদের কথা জানান। স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে এই অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।
তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনের বিশ্বসেরা প্রযুক্তি
সংসদে দেওয়া বক্তব্যে পানিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, “তিস্তা পাড়ের অবহেলিত মানুষ বছরের পর বছর ধরে প্রলয়ংকরী বন্যা ও নদী ভাঙনের শিকার হয়ে চরম মানবিক সংকটের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছে। এই সংকট থেকে উত্তরবঙ্গবাসীকে স্থায়ী মুক্তি দিতে বর্তমান সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।”
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফল চীন সফরের দ্বিপাক্ষিক অর্জন তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন:
“নদী শাসন ও সামগ্রিক পানি ব্যবস্থাপনায় চীনের প্রযুক্তি বর্তমানে পৃথিবীর অন্যতম সেরা। প্রধানমন্ত্রীর এই মেগা সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রীর সাথে অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও কৌশলগত আলোচনা হয়েছে। চীন সরকার তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ বাংলাদেশের সামগ্রিক নদী ব্যবস্থাপনায় ফিজিবিলিটি স্টাডি ও কারিগরি সহায়তা (Technical Support) দিতে সম্পূর্ণ সম্মত হয়েছে। চলতি অর্থবছরেই যৌথ বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে এই সমীক্ষা শেষ করা হবে।”
৭ কোটি মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে আসছে ‘পদ্মা ব্যারেজ’
প্রতিবেশী দেশের পানি নীতির কারণে দেশের পরিবেশগত বিপর্যয়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী বলেন, ফারাক্কা ব্যারেজের চুক্তি থাকা সত্ত্বেও শুষ্ক মৌসুমে—বিশেষ করে প্রতি বছরের মার্চ ও এপ্রিল মাসে উত্তরবঙ্গের মানুষ পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত থাকে। এর ফলে ওই অঞ্চলের কৃষি ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। একই সাথে নদী পদ্ধতিগুলো বিচ্ছিন্ন থাকায় দেশের দক্ষিণাঞ্চলে জলাবদ্ধতা এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেয়ে সুন্দরবনের ইকোসিস্টেম বা প্রাকৃতিক ভারসাম্য ধ্বংসের মুখে পড়েছে।
এই দীর্ঘস্থায়ী ও ঐতিহাসিক সমস্যা সমাধানের অংশ হিসেবে মন্ত্রী সংসদে বড় সুখবর দিয়ে জানান, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) ইতিমধ্যেই ‘পদ্মা ব্যারেজ’ মেগা প্রকল্পটি অনুমোদন বা পাস হয়েছে। খুব শিগগিরই এর আন্তর্জাতিক টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু হবে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ প্রায় সাত কোটি মানুষ সরাসরি সুফল পাবে এবং দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কৃষি ও পরিবেশের আমূল পরিবর্তন ঘটবে।
জিয়াউর রহমানের ‘খাল খনন বিপ্লব’: ২৫ হাজার কিমি’র মেগা টার্গেট
দেশের অভ্যন্তরীণ নদী ও গ্রামীণ অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে সরকারের নতুন জাগরণের কথা উল্লেখ করে পানিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, “শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক ‘খাল খনন বিপ্লবের’ ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকারের নেতৃত্বে সারা দেশে একটি নতুন সামাজিক ও অর্থনৈতিক জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে।”
বিগত চার মাসের অবিশ্বাস্য অগ্রগতি তুলে ধরে তিনি জানান:
-
৪ মাসের অর্জন: জরুরি ভিত্তিতে সারা দেশে ইতিমধ্যেই ৫০০ কিলোমিটার খালের পুনঃখনন কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে।
-
নতুন লক্ষ্যমাত্রা: সরকারের প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা ২০ হাজার কিলোমিটার থাকলেও তা আরও বাড়িয়ে ২৫ হাজার কিলোমিটারে উন্নীত করার মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এই খাল খনন কর্মসূচির ফলে দেশের ভূ-উপরিস্থ পানির প্রাপ্যতা বাড়বে, সেচ সুবিধা সম্প্রসারিত হবে এবং কৃষি উৎপাদন এমন পর্যায়ে পৌঁছাবে যা একসময় দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রফতানি করা সম্ভব হবে।
বিরোধীদলীয় নেতার প্রতি রাজনৈতিক ঐক্যের আহ্বান
বক্তব্যের শেষাংশে সংসদে উপস্থিত বিরোধীদলীয় নেতার উদ্দেশে একযোগে দেশ গড়ার উদাত্ত আহ্বান জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, “বিগত দীর্ঘ ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসন, অবর্ণনীয় অত্যাচার ও চরম নির্যাতনের বিরুদ্ধে রাজপথে কঠিন আন্দোলন এবং ঐক্যবদ্ধ থেকে আজ আমরা সকলে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে এই পবিত্র সংসদে এসেছি। দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন এবং চলমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ কঠিন চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় এই রাজনৈতিক ঐক্যের ধারা বজায় রেখে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।”







