আওয়ামী আমলের লুটপাটের ধাক্কা: কৃষি খেলাপিতে স্মরণকালের রেকর্ড
 

 

আওয়ামী আমলের লুটপাটের ধাক্কা: কৃষি খেলাপিতে স্মরণকালের রেকর্ড, মে মাসেই ৩২% ঋণ খেলাপি!

দেশের সামগ্রিক ব্যাংক খাতের পর এবার বড় ধরনের সংকটে পড়েছে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি ঋণ খাত। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো ও ভুয়া নথির মাধ্যমে কৃষি খাতে হওয়া ব্যাপক লুটপাটের ভয়াবহ চিত্র এখন ফুটে উঠছে। নির্ধারিত সময়ে টাকা ফেরত না আসায় এই খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এবং বকেয়া ঋণের হার অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছেছে।

চলতি অর্থবছরের গত মে (২০২৬) মাস শেষে কৃষি খাতে বিতরণ করা মোট ঋণের স্থিতি বা বকেয়ার মধ্যে একলাফে ৩২ শতাংশই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। অথচ দুই বছর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরেও এই খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল মাত্র ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

রোববার (২৮ জুন ২০২৬) বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক প্রকাশিত কৃষি ঋণ প্রবাহ ও আদায় সংক্রান্ত সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এসব উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গেছে।

এক বছরে খেলাপি বেড়েছে প্রায় তিন গুণ

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিগত এক বছরে কৃষি খাতে খেলাপি ঋণ প্রায় তিন গুণ বেড়েছে:

  • মে ২০২৬ পর্যন্ত বাস্তব চিত্র: কৃষি খাতে ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণ করা ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬৩ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। এর মধ্যে রেকর্ড ২০ হাজার১৩০ কোটি টাকা খেলাপিতে পরিণত হয়েছে (যা মোট ঋণের ৩২ শতাংশ)।

  • মে ২০২৫ (আগের বছর): গত বছরের একই সময়ে কৃষি ঋণের স্থিতি ছিল ৫৮ হাজার ৩২১ কোটি টাকা এবং খেলাপি ছিল ৬ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা (যা মোট ঋণের ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ)।

  • ২০২৩-২৪ অর্থবছর: এই অর্থবছরে কৃষি খাতে খেলাপি ঋণের গড় হার ছিল মাত্র ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

সংশ্লিষ্ট সূত্র ও ব্যাংকিং খাতের অর্থনীতিবিদরা জানান, করোনাকালীন বা তার পূর্বের বছরগুলোতে কৃষি খাতে খেলাপি ঋণের স্বাভাবিক হার ছিল ৫ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে এবং অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের ক্রান্তিকালে ব্যাংক খাত থেকে কৃষি বরাদ্দের নামে যে বড় বড় ভুয়া ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল, সেগুলোর একটা বড় অংশই এখন খেলাপি হতে শুরু করেছে।

খেলাপি হওয়ার দ্বারপ্রান্তে আরও ২৩ হাজার কোটি টাকা

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেবল খেলাপি ঋণই নয়, বর্তমানে কৃষি খাতে আদায় না হওয়া বকেয়া বা মেয়াদোত্তীর্ণ (Overdue) ঋণের স্থিতিও আশংকাজনক হারে বেড়েছে। এই বকেয়া ঋণগুলো মূলত খেলাপি হওয়ার আগের ধাপে বা ‘সাব-স্ট্যান্ডার্ড’ অবস্থায় রয়েছে। যদি দ্রুত এগুলো আদায় বা নিয়মিত (নবায়ন) করা না হয়, তবে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এগুলোও খেলাপির খাতায় যুক্ত হবে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের (২০২৫) মে মাস পর্যন্ত কৃষি খাতে বকেয়া ঋণের স্থিতি ছিল ৯ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। কিন্তু চলতি বছরের মে (২০২৬) মাসে তা আড়াই গুণেরও বেশি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ১০৩ কোটি টাকায়

ঋণ বিতরণ বাড়লেও কমেছে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন

প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের গত মে মাসে ব্যাংকগুলোর কৃষি ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা আগের মাসের তুলনায় প্রায় আড়াই শতাংশ কমেছে। তবে সার্বিকভাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসের (জুলাই ২০২৫ থেকে মে ২০২৬) মোট ঋণ বিতরণের পরিমাণ পূর্ববর্তী অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় বেশি হয়েছে, যা কৃষি অর্থায়নের জন্য একটি ইতিবাচক দিক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর সতর্কবার্তা

কৃষি খাতে খেলাপি ও বকেয়া ঋণের এমন উল্লম্ফনে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিবেদনে কঠোর সতর্কবার্তা ও পরামর্শ দিয়েছে:

“মাঠপর্যায়ে প্রকৃত কৃষকদের কাছে কৃষি অর্থায়ন বা ঋণ পৌঁছানোর বিষয়টি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি প্রবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। তবে যেভাবে অস্বাভাবিক হারে খেলাপি ঋণ বাড়ছে, তা ব্যাংক খাতের জন্য নতুন বড় ঝুঁকি। এই খাতের খেলাপি ঋণ আদায় ও ঋণ ব্যবস্থাপনার (Credit Risk Management) বিষয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্ক হতে হবে এবং খেলাপি নিয়ন্ত্রণে কঠোর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।”

অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের প্রান্তিক কৃষকরা সাধারণত ঋণ খেলাপি হন না। রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা বড় বড় ডেইরি, পোল্ট্রি, এগ্রো-ফার্ম এবং ভুয়া সমবায় সমিতির নামে নেওয়া কোটি কোটি টাকার ‘লুটপাটের ঋণই’ আজ দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষি ব্যাংকিং খাতকে এই চরম বিপর্যয়ের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top