কুমিল্লার রেস্তোরাঁয় ২ বছরের পাকিস্তানি শিশুকে ফেলে গেল পরিবার
 

 

মা ভাবলেন বাবার কাছে, বাবা ভাবলেন মায়ের কাছে: কুমিল্লার রেস্তোরাঁয় ২ বছরের পাকিস্তানি শিশুকে ফেলে গেল পরিবার!

“মা ভেবেছিলেন শিশুটি তার বাবার গাড়িতে আছে, আর বাবা ভেবেছিলেন শিশুটি রয়েছে মায়ের গাড়িতে।”—দুই গাড়ির চালক ও বাবা-মায়ের এই চরম মনস্তাত্ত্বিক ভুলের কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার একটি হাইওয়ে রেস্তোরাঁয় দীর্ঘ ৬ ঘণ্টা কাটিয়ে দিল করাচি থেকে আসা দুই বছর বয়সী এক পাকিস্তানি শিশু।

শনিবার (২৭ জুন ২০২৬) সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার মোস্তফাপুর এলাকার ‘জাইতুন রেস্তোরাঁয়’ এই নাটকীয় ও বিরল ঘটনাটি ঘটে। অবশেষে রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষের মহানুভবতা ও ফেসবুক পোস্টের কল্যাণে ৬ ঘণ্টা পর মায়ের কোল ফিরে পেয়েছে শিশুটি।

ঠিক কী ঘটেছিল জাইতুন রেস্তোরাঁয়?

রেস্তোরাঁর সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ এবং মালিকপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) পাকিস্তানের করাচি থেকে ১১ সদস্যের একটি পর্যটক পরিবার বাংলাদেশে ঘুরতে আসে। ঢাকায় একদিন অবস্থানের পর আজ শনিবার ভোরে দুটি হাইace বা মাইক্রোবাসে করে তাঁরা কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের উদ্দেশে রওনা দেন।

সকাল সাড়ে আটটার দিকে তাঁরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার ‘জাইতুন রেস্তোরাঁয়’ যাত্রাবিরতি দিয়ে সবাই মিলে সকালের নাশতা করেন। এ সময় পরিবারের ১১ সদস্য এবং চালকসহ অন্তত ১৪ জন বেশ আড্ডা ও গল্পে মেতে ছিলেন। নাশতা শেষ করে তাঁরা যখন আবার কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা হন, তখন অসাবধানতাবশত ২ বছর বয়সী অবুঝ শিশুটিকে রেস্তোরাঁর ভেতরেই ফেলে রেখে চলে যান।

ভুল ভাঙল চট্টগ্রামের কর্ণফুলী টানেলে গিয়ে!

জাইতুন রেস্তোরাঁর স্বত্বাধিকারী এ কে এম লুৎফুর রহমান ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরে প্রথম আলোকে বলেন, “পরিবারটি দুটি আলাদা গাড়িতে যাতায়াত করছিল। একটি গাড়িতে ছিলেন শিশুটির বাবা, অন্যটিতে তার মা। গাড়ি ছাড়ার সময় মা ভেবেছিলেন শিশুটি হয়তো বাবার কাছে অন্য গাড়িতে উঠেছে। আর বাবা ভেবেছিলেন সে মায়ের কাছেই আছে। দুই গাড়ির কেউই বিষয়টি খেয়াল করেননি।”

তিনি আরও জানান, গাড়ি দুটি দ্রুত গতিতে কুমিল্লার সীমান্ত পার হয়ে চট্টগ্রামের আনোয়ারা-পতেঙ্গার ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল’ (কর্ণফুলী টানেল) পার হওয়ার পর চা-পানের জন্য আবার যাত্রাবিরতি দেয়। তখন দুই গাড়ির মানুষ এক হতেই মা-বাবার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যায়। তাঁরা বুঝতে পারেন, তাঁদের কলিজার টুকরো কোনো গাড়িতেই নেই!

মোবাইল গেম ও ফেসবুক পোস্টের ম্যাজিক

এদিকে শিশুটিকে ফেলে যাওয়ার পরপরই জাইতুন রেস্তোরাঁর কর্মচারীরা বিষয়টি টের পান। লুৎফুর রহমান বলেন, “আমাদের স্টাফরা বিষয়টি দেখার সাথে সাথে শিশুটিকে এক মুহূর্তের জন্যও আতঙ্কিত হতে দেয়নি। প্রথমে বাবা-মাকে না দেখে শিশুটি খুব কান্নাকাটি করছিল। কিন্তু আমাদের কর্মচারীরা দ্রুত তাকে কোলে তুলে নেয়, মোবাইলে কার্টুন ও ভিডিও দেখায় এবং খেলাধুলায় ব্যস্ত রাখে। এতে শিশুটি কান্না ভুলে হাসিখুশি হয়ে ওঠে।”

রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং সদর দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) অবহিত করেন। পাশাপাশি আইনি জটিলতা এড়াতে ও পরিবারটিকে খুঁজতে জাইতুন রেস্তোরাঁর অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে শিশুটির ছবিসহ একটি জরুরি পোস্ট দেওয়া হয়।

টানেলের মুখে দাঁড়িয়ে যখন পাকিস্তানি পরিবারটি দিশেহারা, তখনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জাইতুন রেস্তোরাঁর সেই ফেসবুক পোস্টটি তাঁদের নজরে আসে। তারা দ্রুত রেস্তোরাঁ নম্বরে যোগাযোগ করেন এবং ভিডিও কলের মাধ্যমে শিশুটিকে দেখে নিশ্চিত হন।

৬ ঘণ্টা পর আবেগঘন পুনর্মিলন

ভিডিও কলে কথা বলার পর চট্টগ্রাম থেকে উল্টো পথে গাড়ি ছুটিয়ে বেলা আড়াইটার দিকে পুনরায় কুমিল্লা মোস্তফাপুরের জাইতুন রেস্তোরাঁয় ফিরে আসেন বিদেশি এই পর্যটকরা। রেস্তোরাঁয় পৌঁছামাত্রই শিশুটি দৌড়ে গিয়ে মায়ের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এ সময় পুরো পরিবারটি কান্নায় ভেঙে পড়ে এবং আবেগাপ্লুত এক দৃশ্যের অবতারণা হয়।

পাকিস্তানি পরিবারটির বরাত দিয়ে রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষ জানায়, তাঁরা ১২ দিনের সফরে বাংলাদেশে ঘুরতে এসেছেন। আজ কক্সবাজার যাওয়ার পথে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটে। বাংলাদেশী ভাইদের সততা, আন্তরিকতা এবং শিশুটির প্রতি এমন মাতৃত্বসুলভ যত্নের প্রশংসা করে তারা জাইতুন রেস্তোরাঁ ও বাংলাদেশের মানুষের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top