ভেনেজুয়েলায় বিরল ‘যমজ ভূমিকম্প’ বা ডাবলটের আঘাত, ১৬৪ নিহত
 

 

ভেনেজুয়েলায় বিরল ‘যমজ ভূমিকম্প’ বা ডাবলটের আঘাত: ১৬৪ জনের মৃত্যু, জরুরি অবস্থা ও সুনামি সতর্কতা জারি

দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় এক মিনিটেরও কম সময়ের ব্যবধানে পরপর দুটি শক্তিশালী ও প্রলয়ংকরী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। ভূ-তাত্ত্বিক বিজ্ঞানের ভাষায় অত্যন্ত বিরল ও মারাত্মক এই ঘটনাকে বলা হয় ‘ডাবলট’ (Doublet Earthquake) বা যমজ ভূমিকম্প। বুধবার (২৪ জুন ২০২৬) শেষভাগে ঘটা এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৬৪ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে এবং আহতের সংখ্যা ১,০০০ ছুঁইছুঁই। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও বহু মানুষ আটকে থাকায় হতাহতের সংখ্যা ব্যাপক হারে বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

স্মরণকালের এই ভয়াবহ দুর্যোগের পর দেশটিতে ইতিমধ্যে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ (Delcy Rodríguez)। একই সঙ্গে রাজধানী কারাকাসসহ দেশটির বিস্তীর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলে জারি করা হয়েছে সুনামি সতর্কতা।

ভেনেজুয়েলায় ঠিক কী ঘটেছিল?

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS)-এর তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যায় উত্তর-পশ্চিম ভেনেজুয়েলার সান ফেলিপের কাছে প্রথমে একটি ৭.২ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এর ঠিক ৩৯ সেকেন্ড পর নিকটবর্তী ইউমারে শহরের দক্ষিণ-পূর্বে আরও একটি তীব্র ও বিধ্বংসী ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে।

মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে দুটি বিশাল কম্পন হওয়ায় মাটির ওপরে থাকা বহু বহুতল ভবন, আবাসিক এলাকা ও বাণিজ্যিক কাঠামো তাসের ঘরের মতো হুড়মুড় করে ধসে পড়ে।

বিজ্ঞানের চোখে ‘ডাবলট’ বা যমজ ভূমিকম্প কী?

সাধারণত কোনো বড় ভূমিকম্প হওয়ার পর ওই একই এলাকায় কিছু ছোট ছোট কম্পন বা অনুকম্পন হয়, যেগুলোকে আমরা ‘আফটারশক’ (Aftershock) বলি। কিন্তু ‘ডাবলট’ বা যমজ ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা এবং অনেক বেশি বিধ্বংসী।

ইউএসজিএস-এর সংজ্ঞায়—যখন একই সময়ে এবং খুব কাছাকাছি দূরত্বে প্রায় সমমাত্রার দুটি বড় ভূমিকম্প পরপর ঘটে, তখন তাকে ‘ডাবলট সিকোয়েন্স’ বলা হয়। এটি মূলত মাটির নিচের ফল্ট বা ফাটলরেখাগুলোর মধ্যকার একটি জটিল ও শৃঙ্খলিত ভাঙন প্রক্রিয়া (Chain Reaction)।

সহজ ভাষায়: প্রথম ভূমিকম্পটি যখন মাটির নিচের একটি ফাটলরেখার ওপর জমে থাকা চাপ কমিয়ে দেয়, তখন সেই স্থানচ্যুত বিপুল চাপটি গিয়ে পড়ে পাশের আরেকটি ফল্টলাইন বা ফাটলরেখায়। পাশের ফাটলটি যদি আগে থেকেই ভাঙার মুখে বা সক্রিয় অবস্থায় থাকে, তবে প্রথমটির ধাক্কায় বা তার থেকে তৈরি হওয়া ভূকম্পন তরঙ্গের (Seismic Waves) কারণে সেটিও মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে যায়। এর ফলে সৃষ্টি হয় দ্বিতীয় আরেকটি সমমাত্রার বা তার চেয়ে বড় ভূমিকম্প।

ডাবলট কেন সাধারণ ভূমিকম্পের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বিপজ্জনক?

বিজ্ঞানীরা বলছেন, যমজ ভূমিকম্প সাধারণ কম্পনের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বিপজ্জনক ও প্রাণঘাতী হওয়ার প্রধান কারণ দুটি:

১. একটানা দীর্ঘ ঝাঁকুনি: মাটির ঝাঁকুনি একটানা দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে, যা বহুতল ভবনগুলোকে টিকে থাকার কোনো সুযোগ দেয় না। প্রথম কম্পনে যে ভবনগুলোর কাঠামো দুর্বল বা ফাটল ধরেছিল, দ্বিতীয় কম্পনটি হওয়া মাত্রই সেগুলো মুহূর্তের মধ্যে মাটির সাথে মিশে যায়।

২. উদ্ধারকারীদের জন্য ফাঁদ: প্রথম দফার কম্পন শেষ হওয়ার পরপরই যখন উদ্ধারকর্মীরা ও সাধারণ মানুষ অন্য ভবন থেকে মানুষ বের করতে বা কাজ শুরু করেন, তখনই দ্বিতীয় বড় ধাক্কাটি আসে। ফলে উদ্ধারকারী দল এবং জীবন বাঁচাতে বাইরে আসা ব্যক্তিরা চরম ফাঁদ ও ঝুঁকির মুখে পড়েন।

ইতিহাসে যেখানে আঘাত হেনেছে এই ‘জোড়া ভূমিকম্প’

বিশ্বের ভূ-তাত্ত্বিক ইতিহাসে জোড়া ভূমিকম্প খুব বেশি দেখা না গেলেও যখনই হয়েছে, তা চিরস্থায়ী বিপর্যয় ডেকে এনেছে:

  • তুরস্ক ও সিরিয়া (২০২৩): সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পটি ঘটে ২০২৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি। প্রথমে ৭.৮ মাত্রার একটি ভূমিকম্পের প্রায় ৯ ঘণ্টা পর ৯৫ কিলোমিটার দূরে ৭.৬ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প আঘাত হানে, যাতে প্রায় ৬০ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে।

  • ক্যালিফোর্নিয়া, যুক্তরাষ্ট্র (১৯৮৭): ইম্পেরিয়াল ভ্যালিতে প্রায় ১১ ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি বড় ভূমিকম্প হয়েছিল।

  • ইরান (২০১২ ও ২০২১): ২০১২ সালে মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে ৬.৪ ও ৬.২ মাত্রার দুটি কম্পনে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। ২০২১ সালেও মাত্র ৯০ সেকেন্ডের ব্যবধানে দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়।

  • আফগানিস্তান (২০২৩): হেরাত প্রদেশে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে বেশ কয়েকটি ৬.৩ মাত্রার ডাবলট ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল।

  • ভেনেজুয়েলা (২০২৫): এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বর (২০২৫) মাসেও ভেনেজুয়েলার জুলিয়া ও লারা রাজ্যে ৬.২ এবং ৬.৩ মাত্রার একটি ডাবলট ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল।

বিজ্ঞানীদের মতে, এক সপ্তাহের মধ্যে হওয়া দুটি বড় ভূমিকম্পের মাত্রা যদি একে অপরের ০.২ ইউনিটের কাছাকাছি হয়, তবে তার সম্ভাবনা থাকে মাত্র ৫%। ভেনেজুয়েলার এই মঙ্গল-বুধবারের ঘটনাটি সেই বিরল ও দুর্ভাগ্যজনক ৫ শতাংশেরই অংশ, যা দেশটিকে গত ১২৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও স্মরণকালের নিকৃষ্টতম প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top