বেইজিংয়ে বাংলাদেশ-চীনের ঐতিহাসিক ১৩টি সমঝোতা স্মারক সই
 

 

বেইজিংয়ে বাংলাদেশ-চীনের ঐতিহাসিক ১৩টি সমঝোতা স্মারক সই: মিডিয়া, কারিগরি শিক্ষা ও বিনিয়োগে মেগা চুক্তি

বাংলাদেশের নতুন সরকারের বৈদেশিক নীতি ও অর্থনৈতিক কূটনীতিতে এক বিশাল মাইলফলক অর্জিত হলো। চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’-এ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফলপ্রসূ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে দুই দেশের মধ্যে ১৩টি সমঝোতা স্মারক (MoU) এবং ১টি বিশেষ কো-অপারেশন প্ল্যান আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২৫ জুন ২০২৬) স্থানীয় সময় বিকেলে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে এই চুক্তিগুলো সই হয়। বাংলাদেশের পক্ষে সমঝোতা স্মারকে সই করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনসহ প্রতিনিধি দলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তোপধ্বনি ও গার্ড অব অনার

এর আগে বিকেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বেইজিংয়ের রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘দিয়াওইউতাই’ থেকে বিশেষ মোটর শোভাযাত্রা সহকারে গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ পৌঁছালে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান।

formal সংবর্ধনা মঞ্চে দুই দেশের জাতীয় সংগীত পরিবেশনের পাশাপাশি চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির (PLA) একটি সুসজ্জিত চৌকস দল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে সশস্ত্র সালাম (গার্ড অব অনার) প্রদান করে। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্মানে বেইজিংয়ের আকাশে ২১ বার তোপধ্বনি দেওয়া হয় এবং পরে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী সশস্ত্র বাহিনীর কুচকাওয়াজ ও প্যারেড পরিদর্শন করেন।

১৩টি সমঝোতা স্মারকের মূল ক্ষেত্রসমূহ

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বেইজিংয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য মুখপাত্র মাহদী আমিন সই হওয়া চুক্তিগুলোর বিস্তারিত রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি জানান, এই চুক্তিগুলো মূলত বাংলাদেশের অবকাঠামো রূপান্তর, বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং আধুনিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে করা হয়েছে:

  • গণমাধ্যম ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ৪টি চুক্তি: বাংলাদেশে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, স্যাটেলাইট তথ্য আদান-প্রদান এবং গণমাধ্যম খাতের সামগ্রিক আধুনিকায়নে জহির উদ্দিন স্বপনের উপস্থিতিতে ৪টি পৃথক সমঝোতা স্মারক সই হয়।

  • কারিগরি (ভোকেশনাল) শিক্ষা: দেশের তরুণ সমাজকে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযুক্ত করতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মানোন্নয়ন ও আধুনিকায়নে ২টি পৃথক মেগা চুক্তি সই হয়েছে।

  • বিনিয়োগ ও সবুজ উন্নয়ন (Green Development): বাংলাদেশে চীনের বড় আকারের সরাসরি আর্থিক বিনিয়োগ (FDI) এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের জন্য সমঝোতা স্মারক সই হয়।

  • গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (GDI): এর অধীনে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের আধুনিকায়ন, শিক্ষা ও যুবকদের আইটি দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এছাড়া মানবসম্পদ উন্নয়নে একটি পৃথক কো-অপারেশন প্ল্যান সই হয়েছে।

  • চীন বাজারে বাংলাদেশের কাঁঠাল রফতানি: কৃষিপণ্যের বাণিজ্য প্রসারে বাংলাদেশ থেকে চীনের বিশাল বাজারে জাতীয় ফল কাঁঠাল আনুষ্ঠানিকভাবে রফতানি সংক্রান্ত একটি বাণিজ্যিক এমওইউ সই হয়েছে।

“তারেক রহমানের প্রতি চীনের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে”

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক উপদেষ্টা রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের রাজনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন:

“দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে চীন সরকার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্ব ও তাঁর সরকারের প্রতি বেইজিংয়ের সম্পূর্ণ ও অনমনীয় সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে। বাণিজ্য, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও সংস্কৃতিসহ সকল বৈশ্বিক বিষয়ে চীন বাংলাদেশের সঙ্গে সর্বোচ্চ সমন্বয় করে কাজ করতে চায়।”

হুমায়ুন কবির আরও জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বৈঠকে অত্যন্ত জোরালোভাবে রোহিঙ্গা সংকটের প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেছেন। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের দ্রুত ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে চীন কূটনৈতিকভাবে বাংলাদেশের পাশে থাকবে এবং সরাসরি মধ্যস্থতা করবে বলে প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং আশ্বস্ত করেছেন। চীন বর্তমান সরকারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল

সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন অত্যন্ত উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, “চীনের মতো একটি বৈশ্বিক পরাশক্তি আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে যেভাবে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ও তোপধ্বনি দিয়ে বরণ করেছে, তাতে আমরা অভিভূত। আমরা মনে করি, প্রধানমন্ত্রীর এই ঐতিহাসিক সম্মানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও বহুলাংশে উজ্জ্বল হয়েছে।”

এই হাই-প্রোফাইল সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনিসহ বেইজিং সফররত বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সফরসূচি অনুযায়ী, আগামীকাল ২৬ জুন (শুক্রবার) চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top