সুইজারল্যান্ডের লেক লুসার্ন সম্মেলনের প্রথম দিনেই বিশ্ব রাজনীতি ও জ্বালানি বাজারের ইতিহাসে এক বড় ধরনের বরফ গলার ঘটনা ঘটলো। ইরানের তেল বিক্রির ওপর দীর্ঘ বছর ধরে জারি থাকা কঠোর আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করে নিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আজ সোমবার (২২ জুন ২০২৬) মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় (US Department of the Treasury) থেকে এই সংক্রান্ত একটি বিশেষ সাধারণ লাইসেন্স ইস্যু করা হয়েছে।
আজ ওয়াশিংটনে এক জরুরি সংবাদ ব্রিফিংয়ে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট (Scott Bessent) এই ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন। গতকাল রোববার সুইজারল্যান্ডের পাহাড়ি অঞ্চল বার্গেনস্টকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফের মধ্যে শুরু হওয়া উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক ও চতুর্মুখী আলোচনার পরদিনই এই ইতিবাচক অগ্রগতি এলো।
২১ আগস্ট পর্যন্ত উন্মুক্ত বিশ্ববাজার: এক্স-এ মার্কিন অর্থমন্ত্রীর ঘোষণা
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি নিশ্চিত করে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট আজ তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার)-এর এক পোস্টে লিখেছেন:
“ইরান কৌশলগত হরমুজ প্রণালিতে বৈশ্বিক বাণিজ্যিক ও তেলবাহী জাহাজের অবাধ ও উন্মুক্ত চলাচলের সুবিধা পুনরায় নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে। একই সঙ্গে তারা আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (IAEA) পরিদর্শকদের ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতে কোনো বাধা ছাড়াই প্রবেশ ও তদারকির অনুমতি দিতে রাজি হয়েছে। তাই পারমাণবিক চুক্তির চূড়ান্ত অগ্রগতির অংশ হিসেবে মার্কিন অর্থ বিভাগ ইরানি তেলের উৎপাদন, সরবরাহ ও বিশ্ববাজারে বিক্রির অনুমোদন দিয়ে সাময়িক ৬০ দিনের একটি সাধারণ লাইসেন্স (General License) ইস্যু করেছে।”
মার্কিন অর্থ বিভাগের নিয়ম অনুযায়ী, এই বিশেষ সাধারণ লাইসেন্সের আওতায় আগামী ২১ আগস্ট ২০২৬ রাত ১২টা ১ মিনিট পর্যন্ত ইরান কোনো ধরনের মার্কিন বা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও এশিয়াসহ বিশ্বের যেকোনো রাষ্ট্রে বৈধভাবে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বিক্রি, রফতানি ও সরবরাহ করতে পারবে।
ট্রাম্প প্রশাসনের কৌশল ও বিশ্ব অর্থনীতিতে স্বস্তি
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কূটনীতিবিদ ও আলোচকেরা ইরানকে বছরের পর বছর ধরে চলা এই নিষেধাজ্ঞা থেকে সাময়িক নিষ্কৃতি দিতে রাজি হয়েছেন মূলত একটি বড় শর্তে—তাহলো লেবানন ও ইসরায়েল যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে ইরান যাতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী ‘স্ট্রেইট অব হরমুজ’ (Hormuz Strait) কোনো অবস্থাতেই বন্ধ না করে। ইরান এই শর্ত মেনে নেওয়ায় বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ শতভাগ স্বাভাবিক হবে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের আকাশচুম্বী দাম অনেকটাই কমিয়ে আনবে বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।
দীর্ঘদিন ধরে ধুঁকতে থাকা ইরানের ভঙ্গুর অর্থনীতির জন্য এই ৬০ দিনের তেল বিক্রির সুযোগকে একটি বড় ‘লাইফলাইন’ বা আশীর্বাদ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ইরান তাদের অবরুদ্ধ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক তারল্য ফিরে পাবে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টকে প্রথম দিনেই মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের মধ্যে যে অভূতপূর্ব অগ্রগতি হয়েছে, তা আগামী ৬০ দিনের মধ্যে দুই দেশকে একটি স্থায়ী ও ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তির দিকে নিয়ে যেতে পারে।







