প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বগুড়ায় সীমান্ত ও দিগন্ত ইউনিয়নের নাম প্রধানমন্ত্রী
 

 

প্রতিমন্ত্রীর ছেলেদের নামে ইউনিয়নের নামকরণ বিতর্ক: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে বগুড়ায় নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ

বগুড়ার মোকামতলা ও শিবগঞ্জ অঞ্চলে নবগঠিত ইউনিয়নের নামকরণ নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক ও স্বজনপ্রীতির সমালোচনার মুখে অবশেষে কঠোর হস্তক্ষেপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের দুই ছেলের নামের সাথে মিল রেখে রাখা নবগঠিত ‘সীমান্ত’ ও ‘দিগন্ত’ ইউনিয়নের নাম অবিলম্বে পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

আজ শুক্রবার (১৯ জুন ২০২৬) বিকেলে বগুড়ার জেলা প্রশাসক (ডিসি) তৌফিকুর রহমান গণমাধ্যমকে এই সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করেছেন।

প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি ফোন: হবে নতুন গণশুনানি

বগুড়ার জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান জানান:

“আজ শুক্রবার বিকালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরাসরি ফোনে আমাকে দুটি ইউনিয়নের নাম পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। তাঁর নির্দেশনা মোতাবেক ইউনিয়ন দুটির নাম পরিবর্তনে আমরা ইতিমধ্যেই প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু করেছি। নতুন নাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে এবার কোনো লবিং বা তড়িঘড়ি নয়, বরং স্থানীয় জনগণের মতামত, এলাকার সুদীর্ঘ ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং ভৌগোলিক পরিচিতিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পুনরায় স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ‘গণশুনানি’ করা হবে। এরপর নতুন নাম চূড়ান্ত করে তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে।”

বিতর্কের নেপথ্যে: প্রতিমন্ত্রীর দুই ছেলে, পৈতৃক বাড়ি ও লন্ডন প্রবাসী ভাতিজি

অনুসন্ধানে জানা যায়, বগুড়ার শিবগঞ্জ ও মোকামতলা উপজেলা ভেঙে সম্প্রতি ‘মীরবাড়ী’, ‘সীমান্ত’, ‘দিগন্ত’ ও ‘স্বর্ণগ্রাম’ নামে চারটি নতুন ইউনিয়ন গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রতিমন্ত্রীর ডিও লেটারের (আধা-সরকারি পত্র) পর শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জিয়াউর রহমান এ ব্যাপারে প্রশাসনিক উদ্যোগ নেন। ৩ জুনের এক সভায় উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি মাহবুব আলম মানিকসহ কতিপয় নেতাকর্মী এই নামগুলোর প্রস্তাব করেন।

বাস্তবে গণশুনানি না করে টেবিল টক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে নামগুলো পাস করার অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়রা জানান, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে খুশি করতে তাঁর পৈতৃক বাড়ির নামে ‘মীরবাড়ী’, দুই ছেলের নামে ‘সীমান্ত’ ও ‘দিগন্ত’ এবং তাঁর লন্ডন প্রবাসী ভাতিজির নামে ‘স্বর্ণগ্রাম’ ইউনিয়নের নামকরণের সুপারিশ জেলা প্রশাসকের দপ্তরে পাঠানো হয়। এরপর গত ১১ ও ১৪ জুন এই নামেই চূড়ান্ত সরকারি গেজেট প্রকাশ করা হয়েছিল।

সংসদে জামায়াত এমপির তোপ, প্রতিমন্ত্রীর ‘মিরাকল’ যুক্তি

এই নামকরণ নিয়ে সম্প্রতি জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনেও তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে। জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ সংসদে সরাসরি স্বজনপ্রীতি ও নীতি-নৈতিকতার প্রশ্ন তুলে প্রতিমন্ত্রীর তীব্র সমালোচনা করেন।

জবাবে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সংসদে দাবি করেন, এই নামকরণ সম্পূর্ণ ‘কাকতালীয়’ এবং ‘মিরাকলি’ (অলৌকিকভাবে) হয়েছে। তিনি যুক্তি দেন, একটি ইউনিয়ন গাবতলী ও সোনাতলার সীমান্তে অবস্থিত হওয়ায় তার নাম ‘সীমান্ত’ এবং অন্যটি গাইবান্ধার সীমানার কাছে অনেক দূরে হওয়ায় তার নাম ‘দিগন্ত’ রাখা হয়েছে। এর পেছনে তাঁর কোনো ব্যক্তিগত ভূমিকা বা হাত নেই।

তবে স্থানীয় ভরিয়া গ্রামের কৃষক সিরাজুল ইসলাম, শিক্ষক মিজানুর রহমানসহ সাধারণ গ্রামবাসীরা জানান, নামকরণের বিষয়ে এলাকায় কোনো গণশুনানিই হয়নি। এটি মূলত প্রতিমন্ত্রীর প্রভাব খাটানোর একটি নগ্ন উদাহরণ।

সব জমানায় বহাল তবিয়তে প্রভাবশালী শাহে আলম

বগুড়ায় মীর শাহে আলম অত্যন্ত প্রভাবশালী ও ধনাঢ্য রাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। স্থানীয়রা জানান, এর আগেও খোদ প্রতিমন্ত্রীর নাম এবং তাঁর পিতা-মাতার নামে স্থানীয় একটি কলেজ ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নামকরণ করা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা বিএনপির কয়েকজন প্রবীণ নেতা জানান, আওয়ামী লীগের বিগত দীর্ঘ ১৭ বছরের শাসনামলেও শাহে আলম বহাল তবিয়তে ছিলেন। তৎকালীন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী মন্ত্রীদের সঙ্গে তাঁর দহরম-মহরম ছিল ওপেন সিক্রেট। জেলা বিএনপির সহসভাপতি পদে থাকলেও ওই সময়ে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা-বাণিজ্য ও ঠিকাদারি নিয়ে তাঁকে কোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক বেগ পেতে হয়নি।

এই নামকরণের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশের পর প্রতিমন্ত্রীর কর্মী-সমর্থকেরা স্থানীয় একটি পত্রিকার বিরুদ্ধে মামলাও ঠুকে দিয়েছেন। তবে প্রধানমন্ত্রীর এই অনমনীয় ও তাৎক্ষণিক অ্যাকশনের পর মোকামতলা ও শিবগঞ্জের সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top