বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম ক্ষমতাধর ও বহুল আলোচিত-সমালোচিত সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এবং র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের (Interpol) সহযোগিতায় দুবাই থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আজ রবিবার (১৪ জুন ২০২৬) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক জরুরি বিবৃতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাবেক এই শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তার গ্রেপ্তারের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন। তিনি একে ‘বাংলাদেশ পুলিশের একটি ঐতিহাসিক সাফল্য’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, এর মাধ্যমে দেশ অবশেষে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হবে।
ভিসা জালিয়াতি ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের ৬ মামলা
বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তারের খবর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিশ্চিত করার পরপরই সেগুনবাগিচায় এক জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সেখানে দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম জানান, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে বর্তমানে দুদকের দায়ের করা মোট ৬টি মামলা রয়েছে।
মামলাগুলোর সর্বশেষ অবস্থা:
-
১টি মামলা: জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অবৈধ সম্পদ অর্জনের এই মামলাটিতে ইতিমধ্যে আদালতে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে এবং বর্তমানে এর বিচারিক প্রক্রিয়া বা ট্রায়াল চলছে।
-
৫টি মামলা: পাসপোর্ট জালিয়াতি, ভুয়া তথ্য প্রদানসহ অন্য পাঁচটি চাঞ্চল্যকর মামলার তদন্ত কার্যক্রম বর্তমানে গতিশীল রয়েছে।
দুদক জানায়, ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেই এই মামলাগুলোর তদন্তে স্থবিরতা কেটে যায়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালে দুদকের আবেদনের প্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইন্টারপোলে বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারের জন্য ‘রেড নোটিশ’ (Red Notice) জারির আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পাঠানো হয়েছিল। সেই রেড নোটিশের ভিত্তিতেই দুবাই পুলিশ তাঁকে আটক করে।
৩০ দিনের মধ্যে দেশে প্রত্যর্পণের আলটিমেটাম
সাবেক এই প্রভাবশালী পুলিশ কর্মকর্তাকে ঠিক কী প্রক্রিয়ায় এবং কতদিনের মধ্যে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে, তার একটি আইনি ও কূটনৈতিক ব্যাখ্যা সংসদে দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি জানান, গত ১২ জুন বাংলাদেশ পুলিশ দুবাইয়ের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (NCB) থেকে একটি অফিশিয়াল ইমেইল পেয়ে বিষয়টি জানতে পারে। এনসিবি আবুধাবি (ইউএই) বাংলাদেশকে জানিয়েছে যে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফেডারেল আইন নম্বর ৩৯ (২০০৬) অনুযায়ী:
গ্রেপ্তার বা আটকের তারিখ থেকে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে একটি আনুষ্ঠানিক ‘এক্সট্রাডিশন রিকোয়েস্ট’ বা আসামী প্রত্যর্পণের আবেদন প্রেরণ করতে হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে আশ্বস্ত করেন যে, ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৪২০ (প্রতারণা), ৪৬৭, ৪৬৮ (জালিয়াতি) এবং বাংলাদেশ পাসপোর্ট অর্ডার ১৯৭৩-এর ১১ ধারায় বিচারাধীন মামলার সমস্ত দলিলাদি ও ওয়ারেন্ট দুদক ইতিমধ্যে প্রস্তুত করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দ্রুততম সময়ে এই প্রত্যর্পণ প্রস্তাব অনুমোদন করে কূটনৈতিক চ্যানেলে এনসিবি আবুধাবির কাছে পাঠাবে এবং ৩০ দিনের সময়সীমার অনেক আগেই বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে এনে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে।
রেশনাল থেকে বোট ক্লাব: লিজেন্ডারি বিতর্কিত ক্যারিয়ার
বেনজীর আহমেদ ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে টানা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি পদে (ডিএমপি কমিশনার, র্যাব মহাপরিচালক এবং আইজিপি) দায়িত্ব পালন করেন। সরকারি চাকুরিজীবী হয়েও প্রকাশ্যে রাজনৈতিক দলের পক্ষে বক্তব্য দিয়ে তিনি সবসময় কড়া সমালোচনার মুখে পড়েছেন।
তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যায়গুলো:
-
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা: র্যাবের মহাপরিচালক (২০১৫-২০২০) থাকাকালীন বাংলাদেশে ব্যাপক ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাঁর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। যদিও তিনি ‘ক্রসফায়ার’ বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে ‘সস্তা প্রচারণা’ বলতেন এবং এক সেমিনারে বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন—“আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কি অস্ত্র দেওয়া হয়েছে হাডুডু খেলার জন্য?”
-
বোট ক্লাব কেলেঙ্কারি: ২০২১ সালের জুনে ঢাকার সাভারের ‘বোট ক্লাব’-এ একজন চলচ্চিত্র অভিনেত্রীকে কেন্দ্র করে এক অপ্রীতিকর ঘটনার পর প্রকাশ পায় যে, একজন সরকারি আমলা হওয়া সত্ত্বেও বেনজীর আহমেদ নিজেই সেই বিলাসবহুল বাণিজ্যিক ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। একজন সরকারি চাকুরিজীবীর এমন বিপুল অর্থের উৎস নিয়ে তখন সংসদেও প্রশ্ন উঠেছিল।
-
বালুর ট্রাক ও শাপলা চত্বর: ২০১৩ সালের মে মাসে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের ওপর চালানো ক্র্যাকডাউন এবং একই বছরের ডিসেম্বরে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গুলশানে খালেদা জিয়ার বাসার সামনে বালুর ট্রাক দিয়ে রাস্তা আটকে অবরুদ্ধ করার ঘটনার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদের নাম রাজনৈতিক মহলে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।
-
সম্পদ জব্দ: ২০২৪ সালের মে মাসে ঢাকার একটি জাতীয় পত্রিকায় তাঁর হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের ফিরিস্তি ফাঁস হলে দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এরপরই তিনি সপরিবারে দেশ ছেড়ে দুবাই পালিয়ে যান। পরবর্তীতে আদালতের আদেশে গোপালগঞ্জে অবস্থিত তাঁর সাভানা রিসোর্ট ও ন্যাচারাল পার্কসহ বিশাল সম্পত্তি ক্রোক ও জব্দ করে জেলা প্রশাসন।







