খুলনা মহানগরীর দৌলতপুরের পশ্চিম কাশীপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র জামে মসজিদে ফজরের নামাজের পর পবিত্র প্রাঙ্গণেই মুসল্লিদের লক্ষ্য করে অতর্কিত ও নৃশংস গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনায় মসজিদ কমিটির সেক্রেটারি ও একজন ব্যবসায়ী গুলিবিদ্ধ হয়ে রক্তাক্ত হয়েছেন। চাঞ্চল্যকর এই হামলার রহস্য উদ্ঘাটনে চোরাই তেলের কারবার, চরমপন্থী গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা এবং ঠিকাদারি ব্যবসায়ের বিরোধসহ একাধিক স্পর্শকাতর দিক সামনে রেখে জোরদার তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
আজ রবিবার (১৪ জুন ২০২৬) ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে এই ঘটনা ঘটলেও বিকেল পর্যন্ত থানায় কোনো আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করা হয়নি এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
নামাজ শেষে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত ও জিকিরের সময় হামলা
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রতিদিনের মতো আজ ভোরেও ফজরের নামাজ শেষে মসজিদের ভেতরে বসে একা একা পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করছিলেন মসজিদ কমিটির সেক্রেটারি লোকমান হাকিম (৪৫)। আর একই সময়ে মসজিদের বারান্দায় বসে একা জিকির করছিলেন কাপড় ব্যবসায়ী আলম শেখ (৫৫)।
মসজিদের ইমাম আমানত উল্লাহ ঘটনার বিবরণ দিয়ে বলেন:
“আমি ২৬ বছর ধরে এই মসজিদে খেদমত করছি। ফজরের নামাজের পর লোকমান হাকিম সাহেব কিছু সময় আমার সঙ্গে কোরআন শরিফ পড়েন। এরপর আমি বাসায় চলে যাই। তখনো তিনি তিলাওয়াত করছিলেন এবং আলম শেখ বারান্দায় বসে জিকির করছিলেন। এর ঠিক আধা ঘণ্টা পর আমি গোলাগুলির খবর পাই।”
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, ইমাম চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা আকস্মিকভাবে মসজিদের ভেতরে ঢুকে লোকমান হাকিমকে লক্ষ্য করে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে পরপর বেশ কয়েকটি গুলি ছোড়ে। এ সময় বারান্দায় থাকা আলম শেখও গুলিবিদ্ধ হন। দুজনেই রক্তাক্ত অবস্থায় মসজিদের মেঝেতে লুটিয়ে পড়লে দুর্বৃত্তরা দ্রুত পালিয়ে যায়। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় লোকমান হাকিম নিজেই মুঠোফোনে কোনোমতে তাঁর স্বজনদের বিষয়টি জানান।
আশঙ্কাজনক অবস্থায় সেক্রেটারি লোকমান ঢাকায় স্থানান্তরিত
গুলিবিদ্ধ দুই মুসল্লিকে প্রথমে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে লোকমান হাকিমের শরীরে একাধিক গুলি লাগায় এবং তাঁর অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য আজই তাঁকে জরুরি ভিত্তিতে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। অন্য আহত মুসল্লি ও কাপড় ব্যবসায়ী আলম শেখ বর্তমানে খুলনায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
নিয়মিত এক মুসল্লি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “লোকমান সাহেব প্রতিদিন এশা ও ফজরের নামাজের পর প্রায় এক ঘণ্টা করে কোরআন তিলাওয়াত করতেন। আল্লাহর ঘরের ভেতরে ঢুকে এমন বর্বরোচিত ঘটনা ঘটবে, তা আমরা স্বপ্নেও ভাবিনি। পুরো এলাকায় এখন চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।”
ঘটনাস্থলে ৪ খোসা, সিসিটিভি ফুটেজে বাইক আরোহী ও রেকি
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ রাশিদুল ইসলাম খান জানিয়েছেন, গুলির ঘটনাটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সেখান থেকে চারটি গুলির খোসা ও একটি অব্যবহৃত তাজা গুলি উদ্ধার করেছে।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের হাতে আসা একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, আজ ভোর ৫টা ২৭ মিনিটের দিকে (হামলার ঠিক তিন মিনিট আগে) মসজিদের সামনে দিয়ে লাল রঙের একটি মোটরসাইকেলে দুই সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে দ্রুত চলে যেতে দেখা যায়। এছাড়া অন্য একটি ফুটেজে আরও একজনকে মসজিদের চারপাশ রেকি (নজরদারি) করতে দেখা গেছে। তবে মসজিদের একদম কাছের মূল সিসিটিভি ফুটেজটি এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ডিজিটাল তথ্য-উপাত্ত ও অন্যান্য ফুটেজ বিশ্লেষণ করে মোটরসাইকেল আরোহীদের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
তদন্তের মূল কেন্দ্রবিন্দু: চরমপন্থী, ওজোপাডিকো ও তেল সিন্ডিকেট
কেএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর) সুদর্শন কুমার রায় জানিয়েছেন, ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে। হামলার নেপথ্যে মূলত তিনটি প্রধান ক্লু বা সূত্র খতিয়ে দেখা হচ্ছে:
-
চরমপন্থী গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা: তদন্তকারীদের একটি বড় অংশ খতিয়ে দেখছে যে, গুলিবিদ্ধ লোকমান হাকিমের সঙ্গে অতীতে বা বর্তমানে কোনো চরমপন্থী বা নিষিদ্ধ আন্ডারগ্রাউন্ড গোষ্ঠীর কোনো যোগাযোগ বা পূর্বশত্রুতা ছিল কি না।
-
চোরাই তেলের কারবার: লোকমান হাকিম খুলনার স্থানীয় একটি তেলের ডিপোর কোম্পানির এজেন্ট হিসেবে কাজ করতেন। খুলনার দৌলতপুর ও খালিশপুর অঞ্চলে চোরাই তেলের বিশাল সিন্ডিকেট ও কালোবাজারি সক্রিয়। এই তেল কারবারসংক্রান্ত কোনো বিরোধের জেরে এই সুপারি কিলিং বা হামলা হয়েছে কি না, তা গুরুত্ব পাচ্ছে।
-
ঠিকাদারি ও রাজনৈতিক বিরোধ: ওজোপাডিকোর (পশ্চিম অঞ্চল বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি) একজন তালিকাভুক্ত প্রথম শ্রেণীর ঠিকাদার ছিলেন লোকমান। ঠিকাদারি ব্যবসার কোনো বড় অঙ্কের লেনদেন, পারিবারিক কোনো শত্রুতা কিংবা কোনো রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা এই হামলার পেছনে কাজ করেছে কি না, তাও যাচাই করা হচ্ছে।
পুলিশের দাবি, লোকমান হাকিম মূলত একজন ব্যবসায়ী হিসেবেই এলাকায় পরিচিত ছিলেন। তাঁর ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক সব কল রেকর্ড (CDR) এবং ডিজিটাল ডাটা খতিয়ে দেখে দ্রুতই অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।







