“আপনারা গুলি করলে কি আমরা বসে থাকব? আমাদের কি গুলি নাই? আমরা কি চুড়ি পরে বসে থাকব?”—ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) উদ্দেশ্যে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) এক বীর সদস্যের এমন বজ্রকঠিন ও তাৎক্ষণিক হুশিয়ারিতে কেঁপে উঠেছে সীমান্ত। জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার রামরামপুর সীমান্তে ভারত থেকে এক বৃদ্ধকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার (পুশইন) চেষ্টাকে কেন্দ্র করে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে এক নজিরবিহীন উত্তেজনাকর পরিস্থিতি ও তীব্র বাক্যবিনিময় সৃষ্টি হয়েছে। বিজিবি ও স্থানীয় বাংলাদেশিদের লাঠিসোঁটা নিয়ে গড়ে তোলা যৌথ প্রতিরোধের মুখে শেষ পর্যন্ত বিএসএফের পুশইনের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।
আজ বুধবার (১০ জুন ২০২৬) সকাল ৬টার দিকে রামরামপুর সীমান্তের শূন্যরেখায় (জিরো লাইন) ভারতের মেঘালয়ের নন্দীরচর বিএসএফ ক্যাম্পের সদস্যদের সঙ্গে বিজিবির এই তুমুল উত্তেজনা ও মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়। বিএসএফের গুলিবর্ষণের হুমকির মুখে বিজিবির পাল্টা বীরোচিত প্রতিরোধে পিছু হটতে বাধ্য হয় ভারতীয় বাহিনী।
ভোররাতে পুশইনের চেষ্টা ও বিজিবির গর্জে ওঠা
স্থানীয় সূত্র ও বিজিবি জানায়, বুধবার ভোরে ভারতের নন্দীরচর বিএসএফ ক্যাম্পের সশস্ত্র সদস্যরা ৬০ বছর বয়সী এক অজ্ঞাতপরিচয় বৃদ্ধকে জোরপূর্বক লাঠি দিয়ে পিটিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাঠানোর চেষ্টা করেন। বিষয়টি টের পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে জিরো লাইনে অবস্থান নেন জামালপুর ৩৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের রামরামপুর ক্যাম্পের জোয়ানেরা। একই সাথে বিজিবির আহ্বানে সাড়া দিয়ে সীমান্তের শত শত বাংলাদেশি সাধারণ মানুষ লাঠিসোঁটা নিয়ে সীমান্তে সমবেত হয়ে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
বিজিবি ও জনতার যৌথ বাধার মুখে ভারতীয় বিএসএফ ওই বৃদ্ধকে বাংলাদেশের সীমানায় ঢোকাতে ব্যর্থ হয়ে সীমান্তের শূন্যরেখায় দাঁড় করিয়ে রাখে।
ব্যর্থ পতাকা বৈঠক ও বিএসএফের গুলির হুমকি
সীমান্তের পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল ও অগ্নিগর্ভ আকার ধারণ করলে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জিরো লাইনে দুই দেশের বাহিনীর মধ্যে এক জরুরি ব্যাটালিয়ন পর্যায়ের পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে জামালপুর ৩৫ বিজিবির সহকারী পরিচালক এবং ভারতের নন্দীরচর বিএসএফ ক্যাম্পের একজন পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) নিজ নিজ দেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেন।
তবে প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী চলা এই পতাকা বৈঠকে কোনো সুষ্ঠু সমাধান আসেনি। বিএসএফ ওই বৃদ্ধকে নিজেদের নাগরিক হিসেবে মেনে নিতে এবং ভারতে ফিরিয়ে নিতে সাফ অস্বীকৃতি জানায়। বৈঠক চলাকালেই দুই বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে চরম তর্ক-বিতর্ক সৃষ্টি হয়।
বিজিবির বীরোচিত জবাব: প্রত্যক্ষদর্শী ও সীমান্তবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, তর্কের একপর্যায়ে মেজাজ হারিয়ে বিএসএফের এক সদস্য বিজিবিকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণের (গুলি করার) হুমকি দেন। বিএসএফের এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের সঙ্গে সঙ্গে তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়েন বিজিবির জোয়ানেরা। বিজিবির এক সদস্য বিএসএফের চোখের দিকে তাকিয়ে উচ্চকণ্ঠে গর্জে উঠে বলেন—“আপনি কেন গুলি করার কথা বললেন? গুলি শুধু আপনার কাছেই আছে, আমাদের কাছে নেই? আপনারা গুলি করলে আমরা কি এখানে চুড়ি পরে বসে থাকব? আপনি এটা কী বললেন, গুলি করবেন কেন বললেন!” বিজিবির এই সিংহভাগ হুশিয়ারির সঙ্গে সঙ্গে সীমান্তে উপস্থিত শত শত বাংলাদেশি সাধারণ মানুষ ‘আল্লাহু আকবার’ ও দেশাত্মবোধক স্লোগান দিয়ে লাঠিসোঁটা উঁচিয়ে বিএসএফকে কড়া হুশিয়ারি দেয়। বিজিবি ও বাংলাদেশিদের এই মারমুখী ও অনড় অবস্থান দেখে বিএসএফ সদস্যরা পিছু হটেন।
শূন্যরেখায় অবস্থান ও সর্বোচ্চ সতর্কতায় বিজিবি
পতাকা বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর দুপুরের দিকে বিএসএফ সদস্যরা আরও কয়েক দফা গোপনে ও প্রকাশ্যে ওই বৃদ্ধকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার অপচেষ্টা চালান। তবে সীমান্তজুড়ে বিজিবি ও স্থানীয়দের কঠোর পাহারার কারণে প্রতিবারই তারা ব্যর্থ হয়। শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষ নিজ নিজ ব্যারাকে ফিরে গেলেও ওই ৬০ বছর বয়সী অসহায় বৃদ্ধকে দুই দেশের মধ্যবর্তী তপ্ত শূন্যরেখাতেই (No Man’s Land) অবরুদ্ধ অবস্থায় রেখে দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনার পর থেকে রামরামপুর সীমান্ত এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি ও তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে।
ঘটনার সত্যতা ও সার্বিক পরিস্থিতি নিশ্চিত করে জামালপুর ৩৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল হাসানুর রহমান বলেন:
“বিগত বেশ কয়েক দিন ধরেই এই রামরামপুর সীমান্ত দিয়ে বিভিন্ন অজুহাতে অবৈধভাবে বাংলাদেশে পুশইনের অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বিএসএফ। আজ সকালে তারা এক ব্যক্তিকে ভারত থেকে শূন্যরেখায় জোর করে ঠেলে পাঠায়। কিন্তু আমাদের বিজিবি সদস্যরা বীরত্ব ও সাহসিকতার সাথে বীর দেশপ্রেমিক এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে তা শক্ত হাতে প্রতিরোধ করেছে। পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা হলেও বিএসএফের একগুঁয়েমির কারণে তা হয়নি। যেকোনো মূল্যে পুশইন ঠেকাতে সীমান্তে বিজিবি এখন সর্বোচ্চ সতর্ক (High Alert) অবস্থায় আছে এবং এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে আমাদের সদস্যরা দিনরাত পাহারায় নিয়োজিত রয়েছেন।”







