দেশের শিক্ষিত ও কর্মক্ষম যুবসমাজকে চাকরিপ্রার্থী না বানিয়ে চাকরিদাতা বা স্বনির্ভর উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে ‘স্টার্টআপ ফান্ড’ নামে ৫০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল গঠন করেছে সরকার। এই তহবিল থেকে দেশের তরুণ-তরুণীরা মাত্র ৪ শতাংশ নামমাত্র সুদে সহজ শর্তে স্টার্টআপ ঋণ বা লোন পাবেন।
মঙ্গলবার (৯ জুন ২০২৬) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় (বাজেট) অধিবেশনের তৃতীয় দিনে নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে এক সংসদ সদস্যের লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই বড় ঘোষণা দেন।
আগামী বাজেটে তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ
সংসদে অর্থমন্ত্রী জানান, যুবসমাজকে সম্পূর্ণ আত্মনির্ভরশীল করতে এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং কর্মসংস্থান ব্যাংকের মাধ্যমে দেশব্যাপী সহজ শর্তে যুব ঋণ বিতরণ কার্যক্রম সাফল্যের সঙ্গে চলমান রয়েছে।
তিনি আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বরাদ্দের একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপরেখা তুলে ধরে বলেন:
-
নতুন প্রস্তাবিত বরাদ্দ: আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি, স্টার্টআপ তহবিল, নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং সামগ্রিক নারী উন্নয়নের জন্য মোট ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে।
-
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ ঋণ: স্টার্টআপ ফান্ডের পাশাপাশি তরুণদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকেও বিশেষ ঋণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর আওতায় অত্যন্ত সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে (সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে) ৭ লাখ থেকে ৩৫ লাখ টাকা পর্যন্ত তরুণ উদ্যোক্তা ঋণ দেওয়া হচ্ছে।
১৩ লাখ কৃষকের ঋণ মওকুফ ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর পরিধি বৃদ্ধি
দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারের নেওয়া কল্যাণমুখী পদক্ষেপের খতিয়ান তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় দেশজুড়ে সুবিধাভোগীর সংখ্যা এবং ভাতার পরিমাণ—উভয়ই উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করেছে।
কৃষি খাতের ওপর থেকে ঋণের বোঝা কমাতে সরকারের এক বিশাল সাফল্যের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “বর্তমান সরকার এ পর্যন্ত দেশের ১৩ লাখ ১৭ হাজার প্রান্তিক কৃষককে সম্পূর্ণ ঋণ মওকুফের (ঋণ মাফ) আওতায় নিয়ে এসেছে। কৃষকদের এই বকেয়া ঋণ মওকুফ সুবিধা নিশ্চিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে ১ হাজার৫৭০ কোটি টাকার একটি বিশাল তহবিল গঠন করা হয়েছে।”
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য বাজেটে বিশেষ চমক
ডিজিটাল অর্থনীতির যুগে তরুণদের একটি বড় অংশ ফ্রিল্যান্সিং ও কনটেন্ট ক্রিয়েশনের সঙ্গে যুক্ত। অর্থমন্ত্রী সংসদে প্রকাশ করেন যে, দেশের তরুণ কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ডিজিটাল মেধা বিকাশের বিষয়ে খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিশেষ ব্যক্তিগত আগ্রহ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এই আগ্রহ ও নির্দেশনার আলোকেই আসছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে দেশের কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ডিজিটাল উদ্যোক্তাদের বিষয়টি বেশ ভালো রকম প্রাধান্য বা বিশেষ সুবিধা পেতে যাচ্ছে।
কারিগরি শিক্ষা ও শেয়ারবাজারের সংস্কার
দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়ে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “বর্তমান সরকারের প্রধানতম নির্বাচনী ও রাষ্ট্রীয় কর্মসূচির মূল ভিত্তিই হচ্ছে তরুণদের জন্য টেকসই কর্মসংস্থান তৈরি করা। আর এই বেকারত্ব দূর করার একমাত্র মোক্ষম উপায় হচ্ছে ‘দক্ষতা উন্নয়ন’ (Skill Development)।”
তিনি জানান, সরকার দেশের প্রথাগত সাধারণ শিক্ষার চেয়ে কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে যুবসমাজের দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে দেশজুড়ে ভোকেশনাল স্কুলগুলোর মানোন্নয়নের পাশাপাশি তরুণদের জন্য যুগোপযোগী আইটি ও কারিগরি স্কিল ডেভেলপমেন্টের ব্যবস্থা করবে বর্তমান সরকার।
প্রশ্নোত্তর পর্বের শেষাংশে দেশের পুঁজিবাজার নিয়ে কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। তিনি অত্যন্ত খোলামেলাভাবে স্বীকার করেন যে, দেশের ক্যাপিটাল মার্কেট (শেয়ারবাজার) বর্তমানে অত্যন্ত খারাপ ও নাজুক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিনোদন ও বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করে অর্থমন্ত্রী দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, দেশের ভেঙে পড়া ক্যাপিটাল মার্কেটকে পুনরায় গতিশীল ও স্বচ্ছ করতে সরকার আইনি ও কাঠামোগত সব ধরনের বড় সংস্কার করতে সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।







