পারমাণবিক বিদ্যুৎ চালুর আগে গ্রিড আধুনিকায়নের নির্দেশ বিদ্যুৎ মন্ত্রীর
 

 

পারমাণবিক বিদ্যুৎ চালুর আগে গ্রিড আধুনিকায়নের নির্দেশ বিদ্যুৎ মন্ত্রীর: গঠিত হচ্ছে ‘জাতীয় গবেষণা কেন্দ্র’

দেশে পারমাণবিক বিদ্যুতের যুগে প্রবেশের প্রস্তুতি হিসেবে বিদ্যমান বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থাকে আরো নিরাপদ, স্মার্ট ও যুগোপযোগী করার বড় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে দ্রুত একটি ‘ওয়ার্কিং পেপার’ প্রস্তুতের নির্দেশ দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।

সোমবার (৮ জুন ২০২৬) সকালে মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে বিদ্যুৎ বিভাগের অধীন সঞ্চালন ও বিতরণ সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও কোম্পানিগুলোর চেয়ারম্যান এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) নিয়ে অনুষ্ঠিত এক বিশেষ পর্যালোচনা সভায় তিনি এ নির্দেশনা দেন। সভায় দেশের বিদ্যমান বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ সক্ষমতা, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, স্মার্ট গ্রিড ব্যবস্থা, গ্রিডে পারমাণবিক বিদ্যুৎ সংযোজনের কারিগরি চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ প্রস্তুতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

বিদেশি পরামর্শক ও জাতীয় গবেষণা কেন্দ্র গঠনের সিদ্ধান্ত

পর্যালোচনা সভায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুতের যুগে প্রবেশের প্রাক্কালে সম্ভাব্য কারিগরি চ্যালেঞ্জগুলো দ্রুত শনাক্ত করে সেগুলো মোকাবিলায় কার্যকর প্রস্তুতি নিতে হবে। একই সঙ্গে দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ ও আধুনিক করতে একটি ‘জাতীয় গবেষণা কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

গ্রিড সুরক্ষায় মন্ত্রীর দেওয়া প্রধান নির্দেশনাগুলো হলো:

  • পিজিসিবি-কে সমীক্ষার নির্দেশ: পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ শুরুর আগেই পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)-কে প্রয়োজনীয় সমীক্ষা পরিচালনা করে একটি ‘কনসেপ্ট পেপার’ তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

  • বিদেশি বিশেষজ্ঞ দ্বারা মূল্যায়ন: পিজিসিবির তৈরি করা কনসেপ্ট পেপারটি পরবর্তীতে নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক ও বিদেশি পরামর্শকদের মাধ্যমে নিখুঁতভাবে মূল্যায়ন করা হবে। তাঁদের দেওয়া সুপারিশের ভিত্তিতেই বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় আধুনিকায়ন সম্পন্ন করা হবে।

  • স্মার্ট গ্রিড সিস্টেম: দেশের বিদ্যুৎ খাতকে ডিজিটালাইজড করতে ‘স্মার্ট গ্রিড সিস্টেম’ বাস্তবায়নের জন্য বিস্তারিত কনসেপ্ট ও ওয়ার্কিং পেপার উপস্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সমন্বয়হীনতার সমালোচনা ও ‘সিস্টেম কলাপ্স’-এর ঝুঁকি

জ্বালানি খাতের রূপান্তর উল্লেখ করে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, “গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে আমরা এখন কয়লা ও সৌরবিদ্যুৎসহ বহুমুখী জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে এগিয়েছি। এখন পারমাণবিক বিদ্যুতের যুগে প্রবেশের প্রস্তুতি চলছে। তবে এর জন্য ট্রান্সমিশন (সঞ্চালন) ও ডিস্ট্রিবিউশন (বিতরণ) ব্যবস্থার মধ্যে পূর্ণ কারিগরি সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি।”

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনা করে বিদ্যুৎ মন্ত্রী অভিযোগ করেন, পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে এ ধরনের সমন্বিত ও দূরদর্শী অবকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় যেকোনো সময় বড় ধরনের বিপর্যয় বা ‘সিস্টেম কলাপ্স’-এর ঝুঁকি রয়ে গেছে। বর্তমান সরকার এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে একটি সমন্বিত প্রস্তুতিমূলক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করছে।

অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পে তদন্তের ঘোষণা

নিরাপত্তার বিষয়ে সর্বোচ্চ জোর দিয়ে মন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দেন, “পারমাণবিক বিদ্যুৎ আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটি উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর ও জটিল কারিগরি ব্যবস্থা হওয়ায় সর্বোচ্চ সতর্কতা ও প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে হবে। জনগণের নিরাপত্তাই আমাদের প্রধান ও একমাত্র অগ্রাধিকার।”

একই সঙ্গে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বিদ্যুৎ খাতের বিগত আমলের অপ্রয়োজনীয় ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নেওয়া প্রকল্পগুলো ইতিমধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব ক্ষতিকর প্রকল্পের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে যথাসময়ে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সভায় বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান সক্ষমতা, চ্যালেঞ্জ ও উন্নয়ন পরিকল্পনার সামগ্রিক অগ্রগতি সম্পর্কে মন্ত্রীকে বিস্তারিত অবহিত করেন বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম এবং পিজিসিবির প্রধান প্রকৌশলী মো. মঞ্জুরুল ইসলাম।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top