শাপলা গণহত্যার ১৩ বছর: শহীদ পরিবারগুলোর অবর্ণনীয় কষ্ট ও বিচার পাওয়ার আকুতি

২০১৩ সালের ৫ মে মধ্যরাতের সেই নারকীয় ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। ‘অপারেশন সিকিউর শাপলা’ নামক সেই অভিযানের এক যুগ পূর্ণ হলেও স্বজন হারানো পরিবারগুলোর জীবনে আজ পর্যন্ত ন্যায়বিচারের আলো পৌঁছায়নি। নিভৃতে কাঁদা এই পরিবারগুলোর বর্তমান চিত্র অত্যন্ত করুণ এবং হৃদয়বিদারক। উপার্জনক্ষম সদস্যদের হারিয়ে বেশিরভাগ পরিবারই এখন চরম দারিদ্র্যের মধ্যে মানবেতর জীবন যাপন করছে। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির অভাব এবং তৎকালীন প্রশাসনের ভয়ে দীর্ঘ সময় তারা নিজেদের স্বজনদের পরিচয় দিতেও কুন্ঠিত ও আতঙ্কিত ছিলেন। এমনকি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে এই হত্যাকাণ্ডের সব ধরনের বিচারিক পথ রুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল এক দশকেরও বেশি সময় ধরে।

ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর বর্ণনায় উঠে এসেছে অবর্ণনীয় কষ্টের সব কাহিনী। শহীদ আবু হানিফের পরিবার এখন পৈতৃক ভিটাতেও মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে জীর্ণ ঘরে বসবাস করছে, যেখানে তার বৃদ্ধ পিতা শারীরিক অসুস্থতা নিয়েও ট্রলারে শ্রমিকের কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। শহীদ শাহ আলমের পঁচাশি ঊর্ধ্ব বৃদ্ধা মা একাকী নিভৃতে দিন কাটাচ্ছেন। অনেক পরিবার আবার ঋণের বোঝায় জর্জরিত; যেমন শহীদ নিজামুল হকের পরিবার স্থানীয় সরকার থেকে প্রাপ্ত সামান্য অনুদানের প্রায় পুরোটাই ব্যয় করেছে পূর্বের ঋণ শোধে। শহীদ ফারহান রাজার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ছিল আরও নির্মম, যার লাশ বুঝে পেতে পরিবারকে সেই সময়ে কয়েক লক্ষ টাকা খরচ করতে হয়েছিল। এই প্রতিটি পরিবারই এখন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে এই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার দাবি করছে।

শাপলা চত্বরের সেই নৃশংসতা নিয়ে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে বছরের পর বছর ধরে ‘অস্বীকারের সংস্কৃতি’ বজায় রাখা হয়েছিল। জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে স্বয়ং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী দাবি করেছিলেন যে সেখানে কেউ মারা যায়নি, বরং সবাই মৃত সেজে থাকার নাটক করেছিল। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও একে রক্তপাতহীন অভিযান বলে দাবি করে আসছিল। অথচ মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য ও বিভিন্ন উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ওই রাতে প্রায় ১ লাখ ৫৫ হাজার রাউন্ড তাজা গুলি চালানো হয়েছিল এবং দিগন্ত ও ইসলামিক টেলিভিশনের সম্প্রচার বন্ধ করে দিয়ে একটি অন্ধকার অধ্যায় সৃষ্টি করা হয়েছিল। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এখন এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত সত্য উন্মোচনের এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসানের একটি নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top