বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাবে শিশুদের মৃত্যুমিছিল: টিকাদান কর্মসূচির সংকট ও নীতিনির্ধারণী ত্রুটির নেপথ্যে

সারা দেশে গত দেড় মাসে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে প্রায় তিনশ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যাদের সিংহভাগই কোমলমতি শিশু। বাংলাদেশে একসময় প্রায় নির্মূল হয়ে যাওয়া এই রোগের এমন ভয়াবহ প্রত্যাবর্তন জনমনে গভীর উদ্বেগ ও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একসময় বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআই কেন এই প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে ব্যর্থ হলো, তা নিয়ে এখন চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। ১৯৮৫ সালে শুরু হওয়া এই কর্মসূচির কল্যাণে ২০২৪ সাল নাগাদ শিশু মৃত্যুহার প্রায় ৮১.৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছিল, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সেই সাফল্যকে ম্লান করে দিয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে না পারা এবং টিকা সংগ্রহের প্রচলিত পদ্ধতি পরিবর্তনের সিদ্ধান্তই এই সংকটের মূলে রয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০২০ সালে করোনা মহামারীর কারণে হামের টিকার বিশেষ প্রচারণা বা ক্যাম্পেইন স্থগিত করা হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি চার বছর অন্তর এই ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা থাকলেও ২০২৪ বা ২০২৫ সালে তা আর আলোর মুখ দেখেনি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর নতুন কোনো উদ্যোগ না নেওয়া এই স্থবিরতার অন্যতম কারণ। এর পাশাপাশি ২০২৫ সালের শুরুতে দীর্ঘদিনের চলে আসা ‘সেক্টর-ভিত্তিক কর্মসূচি’ থেকে বেরিয়ে আসার সরকারি সিদ্ধান্ত বড় ধরনের লজিস্টিক সংকট তৈরি করে। এর ফলে ২০২৪ সাল থেকেই পিসিভি, পেন্টা ভ্যালেন্ট এবং এমআর-সহ শিশুদের জীবনরক্ষাকারী বেশ কিছু টিকার তীব্র অভাব দেখা দেয়।

টিকা কেনা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের গৃহীত দ্বিমুখী নীতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। সাধারণত ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি টিকা কেনা হলেও, গত বছরের সেপ্টেম্বরে অর্ধেক টিকা উন্মুক্ত টেন্ডারের মাধ্যমে কেনার প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ইউনিসেফ সে সময় সতর্ক করেছিল যে, উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ করতে দীর্ঘ সময় লাগবে, যা মহামারীর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেবে। আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইউনিসেফের এই সতর্কবার্তাকে উপেক্ষা করে ক্রয় প্রক্রিয়া পরিবর্তন করায় টিকার সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। যদিও তৎকালীন নীতিনির্ধারকরা দাবি করেছেন যে, তারা কেবল সরকারি অর্থ সাশ্রয় এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বাজার যাচাই করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, আগস্ট থেকে শুরু হওয়া ক্রয় প্রক্রিয়া চূড়ান্ত অনুমোদন ও অর্থ ছাড়ের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে প্রায় পাঁচ মাস সময়ক্ষেপণ করে।

বর্তমান পরিস্থিতির জন্য নতুন সরকারের দায়িত্বশীলরা পূর্ববর্তী এবং অন্তর্বর্তী প্রশাসনের অদূরদর্শিতা ও গাফিলতিকে সরাসরি দায়ী করছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিশুদের সুরক্ষায় টিকা আনায় অবহেলার কারণে প্রাণহানির বিষয়টি উল্লেখ করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে, বর্তমান স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দ্রুত সংকট নিরসনে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ইউনিসেফকে অগ্রিম অর্থ পাঠিয়ে টিকা সংগ্রহের তোড়জোড় শুরু করেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং একটি প্রশাসনিক অদক্ষতার সংকট। বাংলাদেশে হামের টিকার কাভারেজ কখনোই কাঙ্ক্ষিত ৯৫ শতাংশে না পৌঁছানো এবং মাঝে কয়েক বছর টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের গ্যাপ তৈরি হওয়ার কারণেই আজ লাখ লাখ শিশু ঝুঁকির মুখে পড়েছে। নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমকে রাজনৈতিক বা আমলাতান্ত্রিক জটিলতার ঊর্ধ্বে রাখা না গেলে এমন বিপর্যয় রোধ করা কঠিন হবে বলে তারা সতর্ক করেছেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top