বাংলাদেশের রাজনীতির এক মহীরুহ বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এখন এক নতুন ও জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে যে দলটি বেগম জিয়ার আপসহীন ছায়াতলে ঐক্যবদ্ধ ছিল, তাঁর প্রস্থান কেবল বিএনপির ভেতরেই নয়, বরং দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক সমীকরণে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করেছে। এই সংকটময় মুহূর্তে দলের ভার এখন পুরোপুরি বর্তেছে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপর, যিনি দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে অতি সম্প্রতি দেশে ফিরেছেন। বেগম জিয়ার মৃত্যুর পর উদ্ভূত এই নতুন পরিস্থিতিতে তারেক রহমানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো দলের সংহতি বজায় রাখা এবং তাঁর মায়ের রেখে যাওয়া আদর্শিক উত্তরাধিকারকে যথাযথভাবে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানো। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের মূল চ্যালেঞ্জ হবে দলের তৃণমূল থেকে শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত একতা রক্ষা করা এবং কোনো ধরনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা বিভাজন ছাড়াই আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচন ও গণভোট মোকাবিলা করা।
বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন দলের সাধারণ নেতাকর্মীদের আবেগ ও ঐক্যের শেষ আশ্রয়স্থল। তাঁর অনুপস্থিতিতে তারেক রহমানকে এখন এমন এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে, যিনি কেবল দলীয় নেতারাই নন, বরং দেশের আপামর জনসাধারণের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং স্থিতিশীল অভিভাবক হিসেবে স্বীকৃত হবেন। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখা তারেক রহমানের জন্য একটি অন্যতম অগ্নিপরীক্ষা। ভারত ও পাকিস্তানের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং একই সাথে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে কার্যকর কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখা তাঁর ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের সফলতার ওপর বড় প্রভাব ফেলবে। এছাড়া, রাজনৈতিকভাবে এখন একটি ক্রান্তিকাল চলছে; শেখ হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশে যে নতুন মেরুকরণ তৈরি হয়েছে, সেখানে জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য সমমনা দলগুলোর সঙ্গে জোটবদ্ধ থাকা বা নির্বাচনের পর ‘ঐক্যের সরকার’ গঠন করার মতো সিদ্ধান্তগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও দূরদর্শী হতে হবে।
আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো বেগম জিয়ার শুন্য আসনে প্রার্থী নির্ধারণ এবং সংসদীয় রাজনীতিতে তাঁর শূন্যতা পূরণ করা। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্যেও এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, বেগম জিয়ার ছেড়ে যাওয়া আসনগুলোতে কাদের প্রার্থী করা হবে তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। তারেক রহমানকে তাঁর নিজের মামলাগুলো আইনিভাবে মোকাবিলা করে যেমন রাজনৈতিক শুদ্ধি ঘটাতে হয়েছে, তেমনি এখন দলের অভ্যন্তরে সংস্কার ও নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বের বিকাশ ঘটানোও তাঁর অন্যতম দায়িত্ব। সর্বজন শ্রদ্ধেয় এক নেত্রীর বিদায়ে যে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে, তাকে শক্তিতে রূপান্তর করে একটি আধুনিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার যে আকাঙ্ক্ষা তারেক রহমান ব্যক্ত করেছেন, তা বাস্তবায়ন করাই হবে তাঁর আগামীর দীর্ঘ লড়াইয়ের মূল ভিত্তি। এই সন্ধিক্ষণে তারেক রহমানের প্রতিটি পদক্ষেপই নির্ধারণ করে দেবে আগামীর বাংলাদেশ এবং বিএনপির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।
সূত্র- আলজাজিরা বিশ্লেষণ থেকে







