“আল্লাহর কসম, জীবন দেব কিন্তু চব্বিশের (২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান) অর্জন আমরা কোনোভাবেই হারিয়ে যেতে দেব না। আমরা লজ্জিত, কারণ প্রতিবার দেশের সাধারণ মানুষ, ছাত্র, তরুণ, যুবক ও শ্রমিকেরা বুকের তাজা রক্ত ও জীবন দিয়ে এ দেশে ঐতিহাসিক অর্জন এনে দেয়; কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রতিবারই কিছু লুটেরা সেই অসামান্য অর্জনকে নিজেদের পকেটে পুরে ছিনিয়ে নেয়। আজও ২০২৪ সালের সেই মহান বিপ্লবের ফসল ও অর্জনকে ভুলিয়ে দেওয়ার এবং তা হারিয়ে দেওয়ার এক গভীর নীল নকশা ও চেষ্টা চলছে।”
আজ বৃহস্পতিবার (১৬ ১৬ জুলাই ২০২৬) দুপুরে রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি) মিলনায়তনে এক আবেগঘন আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। জুলাই শহীদ দিবস উপলক্ষ্যে এবং শহীদ আবু সাঈদসহ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সকল বীর শহীদদের স্মরণে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের উদ্যোগে এই আলোচনা সভা ও বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
“২০২৪ না হলে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন না, আমিও বিরোধীদলীয় নেতা হতাম না”
আজকের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, বর্তমান নির্বাচিত সরকার ও বর্তমান জাতীয় সংসদ মূলত ২০২৪-এর ঐতিহাসিক গণআন্দোলনেরই ফসল উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন:
“আজ যে সংসদ ও সরকার গঠিত হয়েছে, সবাই মনেপ্রাণে স্বীকার করেন এটি ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার রক্তের ফসল। অথচ দুঃখের বিষয় হলো— আজ কেউ কেউ সুকৌশলে বলতে চান যে ২০২৪ তেমন একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়, বরং পেছনের বা আগের অংশটাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা তো কখনো বলিনি যে আগের আন্দোলনের অংশগুলো গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। সেই দীর্ঘ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন সংগ্রামেই তো আমরা আমাদের ১১ জন শীর্ষ জাতীয় নেতাকে হারিয়েছি। শত শত সহকর্মীকে হারিয়েছি। অসংখ্য মানুষ বছরের পর বছর বিনা বিচারে কারাগারে গেছেন, চাকরি হারিয়েছেন, নিজের বাড়িঘরে শান্তিতে ঘুমাতে পারেননি। আমরা সেই ত্যাগ ও আত্মত্যাগকে কোনোভাবেই অস্বীকার করি না। কিন্তু এটাও ইতিহাসের এক জ্বলন্ত সত্য যে, ২০২৪-এর সেই জুলাই গণঅভ্যুত্থান যদি না হতো—তবে আজ আমি এখানে বুক ফুলিয়ে বক্তৃতা দিতে পারতাম না, সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হতে পারতাম না, আমাদের কেউ সংসদ সদস্য হতে পারতেন না। একইভাবে জনাব তারেক রহমানও আজ দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন না।”
গণভোটের গণরায় উপেক্ষা ও ‘ব্ল্যাকআউট’ নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য
জুলাই বিপ্লবের মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল ফ্যাসিবাদকে সমূলে উৎপাটন করা এবং রাষ্ট্রে আমূল সংস্কার আনা। এই সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আয়োজিত সাম্প্রতিক গণভোটের যৌক্তিকতা তুলে ধরে বিরোধীদলীয় নেতা ক্ষোভের সাথে বলেন:
“নির্বাচনের আগে সব রাজনৈতিক দলই গণভোটের পক্ষে মাঠে স্লোগান দিয়েছিল। সেই ভোটে দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ সূচক রায় দিয়েছেন। অথচ এখন অত্যন্ত চতুরতার সাথে বলা হচ্ছে— বর্তমান সরকার যেহেতু ৫১ শতাংশ ভোট পেয়ে সরকার গঠন করেছে, তাই ৭০ শতাংশ মানুষের দেওয়া সেই ঐতিহাসিক গণরায় নাকি মানা হবে না! আমি আজ এই প্রকাশ্য মঞ্চ থেকে জানতে চাই, অংকের হিসাবে ৫১ বড়, নাকি ৭০ বড়? আপনারা ঠিক কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় ভোট পেয়েছেন, সেই বিতর্ক কিন্তু বাংলার ইতিহাসে চিরকালের জন্য থেকে যাবে। নির্বাচনের দিন সাড়ে তিন ঘণ্টা ইন্টারনেট ও মিডিয়া ব্ল্যাকআউট করে পর্দার আড়ালে কী করা হয়েছে, দেশের সচেতন জনগণ তার সবকিছুই খুব ভালো করে জানে। সময়মতো বাংলার ইতিহাস ও আগামী প্রজন্ম এর চরম বিচার করবে।”
সংবিধানে গণভোটের কার্যকারিতা নিয়ে সমালোচকদের কটাক্ষ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “কেউ কেউ বলছেন চারটি প্রশ্ন নাকি এতোটাই জটিল ছিল যে তা বুঝতেই ভোটারদের চার ঘণ্টা সময় লাগে! তাহলে দেশের কোটি কোটি মানুষ কীভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিলেন? আপনারা কি বলতে চান যে এই দেশের সব প্রজ্ঞা ও বুদ্ধি কেবল আপনাদের ড্রয়িংরুমের গুটিকয়েক মানুষের মাথায় আছে, আর দেশের ১৮ কোটি মানুষের কোনো বুদ্ধি নেই? এটা গোটা জাতিকে অপমান করার শামিল। আমি শফিকুর নিজে মূর্খ হতে পারি, কিন্তু আমার বাঙালি জাতি কখনো মূর্খ নয়।”
তিনি আরও যোগ করেন, “চারটি প্রশ্ন যদি দেশের মানুষ বুঝতে না পারে, তবে আপনারা যে ৩১ দফা সংস্কারের কথা বলছেন—সেটি এই সাধারণ মানুষ কীভাবে বুঝবে? এগুলো সব গোঁজামিল আর ধোঁকাবাজি। ইতিমধ্যে একজন রাজনীতিবিদ অবলীলায় গণমাধ্যমে বলেছেন, ‘ভোটটা হয়ে যাক, তাই সব দাবি আগে মুখ বুজে মেনে নিয়েছিলাম’। আরেকজন বলেছেন, ‘টোল মওকুফের কথা তো কেবল ভোট পাওয়ার জন্য সস্তা স্লোগান হিসেবে বলা হয়েছিল’। রাজনীতিবিদরা যদি এভাবে প্রকাশ্যে জাতির সাথে লিখিত প্রতারণা করেন, তবে দেশের মানুষ যাবে কোথায়? যারা দেশ চালাবেন, দেশের আইন প্রণয়ন করবেন, তাঁদের তো ন্যূনতম একটা রাজনৈতিক ও নৈতিক মানদণ্ড থাকা উচিত।”
সংসদ থেকে জামায়াতের ওয়াকআউট ও সংবিধান সংশোধন কমিটির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন
জাতীয় সংসদে তড়িঘড়ি করে গঠিত হওয়া ‘সংবিধান সংশোধন বিশেষ কমিটি’র কড়া সমালোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন:
“এখন আমাদেরও বারবার বলা হচ্ছে যে আসুন, আপনারাও এই অগ্রাহ্যের মিছিলে শরিক হন। সংসদে দাঁড়িয়ে আমাদের সংবিধানের সবক দেওয়া হয়। আমি বিনীতভাবে প্রশ্ন করতে চাই— ‘সংবিধান সংশোধন কমিটি’ নামক কোনো কমিটির অস্তিত্ব কি আমাদের বিদ্যমান সংবিধানের কোথাও উল্লেখ আছে? যদি সংবিধানের কোথাও এটি না থাকে, তবে গায়ের জোরে এটি কেন গঠন করা হলো? এটি আসলে আর কিছুই নয়, এটি জুলাইয়ের রক্তাক্ত স্মৃতিকে ভুলিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা এবং ৭০ শতাংশ মানুষের ঐতিহাসিক গণভোটকে আড়াল করার ব্যর্থ প্রয়াস মাত্র। আমরা তাই এই অসাংবিধানিক কমিটির বিরুদ্ধে পরিষ্কারভাবে প্রতিবাদ জানিয়ে সংসদ কক্ষ থেকে ওয়াকআউট করেছি। জনগণের রায়কে আপনারা অপমান করতে চাইলে করুন, কিন্তু মনে রাখবেন— জনগণই শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত বিচার করবে।”
রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে উপমা দিয়ে তিনি বলেন, “চিংড়ি মাছ যখন লাফ দেয়, তখন সে পেছনের দিকে যায়। সে কখনো সামনে যাওয়ার রাস্তা খুঁজে পায় না। একটি জাতি যদি সবসময় কেবল পেছনের দিকেই তাকিয়ে থাকে, তবে সে সামনে এগোবে কীভাবে? আমরা তাই সবসময় বলেছি— আসুন, অতীত হাতড়ানো বন্ধ করে সামনে তাকাই এবং ২০২৪-এর রক্তাক্ত অঙ্গীকারগুলোকে বাস্তবে রূপদান করি।”
“ভারতের লাল কার্ডের পরোয়া করি না, আমাদের আশ্রয় ১৮ কোটি মানুষের হৃদয়ে”
পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সাথে জামায়াতে ইসলামীর সম্পর্ক ও ভূ-রাজনীতি নিয়ে নিজের এবং দলের কঠোর ও আপসহীন অবস্থান পরিষ্কার করেন আমির। তিনি বলেন:
“অনেকেই প্রতিবেশী দেশ নিয়ে দুঃখ প্রকাশ ও আক্ষেপ করেন। আমরাই একমাত্র রাজনৈতিক দল, যাদের তারা (ভারত) কোনোভাবেই পছন্দ করে না। তারা বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলকে দিল্লির মাটিতে লাল গালিচা দিয়ে আমন্ত্রণ জানিয়েছে, শুধু জামায়াতে ইসলামীর ভাগ্যে জুটেছে ‘লাল কার্ড’। কিন্তু আমরা সেই দিল্লির লাল কার্ডের বিন্দুমাত্র পরোয়া করি না। আমরা ভারতের মাটিতে গিয়ে আশ্রয় নেওয়ার চিলতে চিন্তাও কখনো অন্তরে পোষণ করি না। এই সোনার বাংলাদেশই আমাদের একমাত্র দেশ। আমাদের আশ্রয়ের পরম ভরসাস্থল দিল্লির কোনো দরবার নয়, আমাদের আশ্রয় হলো বাংলাদেশের ১৮ কোটি দেশপ্রেমিক মানুষের ভালোবাসা ও পবিত্র অন্তর।”
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদের চমৎকার ও সাবলীল সঞ্চালনায় এই মহতি স্মরণ সভায় সভাপতিত্ব করেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল। সভায় ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের হাজার হাজার নেতাকর্মী এবং জুলাই আন্দোলনে শহীদ পরিবারের সদস্যবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।







