অতিভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও ভয়াবহ পাহাড়ধসের কবলে পড়ে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সামগ্রিক বন্যা পরিস্থিতি এক প্রলয়ংকরী রূপ ধারণ করেছে। একই সাথে শনিবার গভীর রাত থেকে শুরু হওয়া তীব্র মুষলধারে বৃষ্টিতে সকালেই সম্পূর্ণ ডুবে গেছে রাজধানী ঢাকা। তলিয়ে গেছে দেশের প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু খোদ সচিবালয়ও। দেশজুড়ে চলমান এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখন পর্যন্ত নারী ও শিশুসহ মোট ৫১ জনের প্রাণহানির তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
রোববার (১২ ১২ জুলাই ২০২৬) দুপুর পর্যন্ত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং আবহাওয়া অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এই ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
৭ জেলায় প্লাবিত ৫৮ উপজেলা: দুর্গত ১০ লাখ মানুষ, ওপরে কক্সবাজার
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের রোববার দুপুর সাড়ে ১২টার প্রতিবেদন অনুযায়ী— দেশের খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ—এই সাতটি জেলার ৫৮টি উপজেলা, ৩৮৬টি ইউনিয়ন এবং ১১টি পৌরসভা সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
-
প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি: বন্যা ও পাহাড়ধসের কারণে এখন পর্যন্ত ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন আরও ৩৯ জন। জেলাভিত্তিক হিসেবে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে পর্যটন নগরী কক্সবাজারে (২৮ জন), যার মধ্যে ১৫ জন স্থানীয় বাসিন্দা এবং ১৩ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী। এছাড়া চট্টগ্রামে ১৩ জন, বান্দরবানে ৬ জন এবং রাঙামাটিতে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
-
বিপর্যস্ত জনজীবন: দেশের এই সাত জেলায় মোট ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তীব্র স্রোত ও বন্যার পানিতে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ বা পানিবন্দি হয়ে দিন কাটাচ্ছেন ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি পরিবারের লাখ লাখ সদস্য।
-
আশ্রয়কেন্দ্রের চিত্র: দুর্গত মানুষের সুরক্ষায় ইতিমধ্যে ১,১৩১টি জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে, যেখানে বর্তমানে ৪৪ হাজার ৪৫৭ জন মানুষ ঠাঁই নিয়েছেন। ভৌগোলিক হিসেবে সবচেয়ে বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম জেলায় (প্রায় ৫ লাখ ৯৫ হাজার মানুষ) এবং সেখানে প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫০০ পরিবার পানিবন্দি রয়েছে।
মাত্র ৬ ঘণ্টার বৃষ্টিতে ডুবল ঢাকা, রেকর্ড ৭৬ মি.মি. বর্ষণ
ঢাকার বাইরের বন্যা পরিস্থিতির মধ্যেই শনিবার মধ্যরাত থেকে রাজধানী ঢাকায় শুরু হয় শতাব্দীর অন্যতম তীব্র মুষলধারে বৃষ্টি। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার দিবাগত রাত ১২টা থেকে রোববার সকাল ৬টা পর্যন্ত মাত্র ৬ ঘণ্টায় রাজধানীতে রেকর্ড ৭৬ মিলিমিটার (মি.মি.) বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
আবহাওয়াবিদ মো. তরিকুল নেওয়াজ কবীর জানান, চলতি জুলাই মাসের এই সময়ের মধ্যে রাজধানীতে এটিই স্বল্প সময়ে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত। যার ফলে সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসের সকালেই রাজধানী এক চেনা নরককুণ্ডে পরিণত হয়।
অলিগলি থেকে সচিবালয়— সর্বত্রই থইথই পানি, স্থবির জনজীবন
রোববার সকাল থেকেই রাজধানীর প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে সমস্ত অলিগলিতে থইথই করছে পানি। সরেজমিনে দেখা গেছে— গ্রিনরোড, তেজতুরী বাজার, পান্থপথ, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, মণিপুর, ধানমন্ডি ২৭ ও ৩২ নম্বর এলাকা, মোহাম্মদপুর, কালশী, মৌচাক, মালিবাগ এবং মতিঝিলের প্রধান সড়কগুলো সম্পূর্ণ পানির নিচে।
-
শেওড়াপাড়ায় অবর্ণনীয় কষ্ট: সবচেয়ে মারাত্মক জলাবদ্ধতা দেখা গেছে মিরপুরের শেওড়াপাড়া এলাকায়। সেখানে প্রধান সড়কের পাশাপাশি ভেতরের সমস্ত গলিতে কোমর সমান পানি থইথই করছে। রিকশাচালকরা দ্বিগুণ-তিনগুণ ভাড়া দাবি করছেন। বহু বেসরকারি চাকুরিজীবী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, প্রতি বছর ড্রেন পরিষ্কারের শত কোটি টাকার নাটক চললেও সামান্য বৃষ্টিতেই কেন ঢাকা তলিয়ে যায়, তার জবাবদিহিতা দরকার।
-
গাড়ি বিকল ও তীব্র যানজট: ধানমন্ডি ও পান্থপথ এলাকায় সড়কে হাঁটুপানি জমে থাকায় শত শত ব্যক্তিগত গাড়ি, সিএনজি ও মোটরসাইকেলের ইঞ্জিনে পানি ঢুকে সেগুলো বিকল হয়ে মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। কারওয়ান বাজার মোড়ে দায়িত্বরত ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টিআই) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, রাস্তা ও ফুটপাতের পার্থক্য মুছে যাওয়ায় চালকরা গাড়ি চালাতে পারছেন না, ফলে তীব্র যানজট সামাল দিতে পুলিশ হিমশিম খাচ্ছে।
ডুবল প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু: বৃষ্টির এই প্রলয় থেকে বাদ যায়নি দেশের সর্বোচ্চ সুরক্ষিত এলাকা সচিবালয়ও। দুপুর ২টার পরও সচিবালয়ের অভ্যন্তরে ৬ নম্বর ভবনের সামনের প্রধান সড়ক, ৭ নম্বর ভবনের পশ্চিম পাশ, তথ্য অধিদপ্তরের সম্মুখভাগ, ৩ ও ৫ নম্বর ভবনের মাঝখানের সংযোগ সড়কসহ প্রধান ফটক ও প্রেসক্লাবের দিকের গেটে হাঁটু পর্যন্ত পানি জমে থাকতে দেখা গেছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সচিবালয়ের মতো জায়গায় যদি পানি নিষ্কাশনের এই আদিম দশা হয়, তবে দেশের বাকি সাধারণ এলাকার কী অবস্থা হবে? দায়িত্বরতদের অবিলম্বে চাকরি থেকে বরখাস্ত ও জবাবদিহিতায় আনা উচিত।”
এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত দুপুর গড়িয়ে গেলেও রাজধানীর আকাশ মেঘাচ্ছন্ন রয়েছে এবং ক্ষণে ক্ষণে মুষলধারে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় নগরবাসীর চরম দুর্ভোগ ও ক্ষোভ আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।







