রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই ও স্থায়ী সমাধান মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যেই নিহিত রয়েছে বলে দৃঢ় মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি জানিয়েছেন, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বহুমাত্রিক চাপ বাড়ানোর লক্ষ্যে বর্তমান সরকারের অল-আউট কূটনৈতিক তৎপরতা ব্যাপকভাবে জোরদার করা হয়েছে।
বুধবার (৮ জুলাই ২০২৬) বিকেলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় এবং ঐতিহাসিক প্রথম বাজেট অধিবেশনে সিরাজগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. সেলিম রেজার এক তারকা চিহ্নিত প্রশ্নের জবাবে সংসদ নেতা এসব মেগা তথ্য তুলে ধরেন।
জান্তা ও বিদ্রোহী সব পক্ষের সাথে আলোচনার সক্রিয় বিবেচনা
মিয়ানমারের বর্তমান জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও রাখাইনের গৃহযুদ্ধ মাথায় রেখে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে এক নতুন কৌশলগত কূটনীতির কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি সংসদে বলেন:
“বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের স্থায়ীভাবে নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে দ্বিপাক্ষিক ফ্রন্টে মিয়ানমারের মূল জান্তা সরকারের পাশাপাশি রাখাইনে নিয়ন্ত্রণাধীন অন্যান্য সকল পক্ষের (বিদ্রোহী গোষ্ঠী) সঙ্গে সম্ভাব্য যোগাযোগ স্থাপন ও আলোচনার বিষয়টি আমাদের সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে। একই সঙ্গে মূলধারার কূটনীতির পাশাপাশি কনফিডেন্স বিল্ডিং বা বিশ্বাস বৃদ্ধির অন্যান্য ট্র্যাক-২ প্রক্রিয়াও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।”
প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, প্রত্যাবাসনের মূল আইনি ভিত্তি হিসেবে রোহিঙ্গাদের তথ্য যাচাই বা ভ্যারিফিকেশনের (Verification) কাজ নিয়মিতভাবে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় রোহিঙ্গাদের তৃতীয় কোনো দেশে (Third Country Resettlement) পুনর্বাসন বা প্রত্যাবাসনের কার্যক্রমও সফলভাবে চলমান রয়েছে।
জিয়া ও খালেদা জিয়ার ঐতিহাসিক সফলতার পদাঙ্ক অনুসরণ
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকার রোহিঙ্গা সংকটের শান্তিপূর্ণ ও দ্রুততম সমাধানে শতভাগ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ উল্লেখ করে তারেক রহমান অতীতের সফলতার খতিয়ান স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন:
“বিএনপি সরকার রোহিঙ্গা সমস্যার দ্রুত সমাধানের লক্ষ্যে দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক ও বহুপাক্ষিক—সব ফ্রন্টেই জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। এর আগে ১৯৭৮ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং ১৯৯২ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের সফল দূরদর্শী কূটনৈতিক উদ্যোগে সে সময়ের রোহিঙ্গা সংকটের অত্যন্ত দ্রুত ও চমৎকার সমাধান হয়েছিল এবং আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা দ্রুত নিজ দেশে ফিরে যেতে পেরেছিল। বর্তমান সরকারও সেই সফল নীতি ও ধারাবাহিকতায় রোহিঙ্গাদের টেকসই, শান্তিপূর্ণ ও দ্রুত সমাধানের পথ অনুসন্ধান করছে।”
বৈশ্বিক মানবিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে বাংলাদেশ
সংসদ নেতা বলেন, রোহিঙ্গা সংকটকে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও মানবিক আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে সরকার জাতিসংঘসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী দেশ ও আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগসূত্র বজায় রাখছে। নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (UNHCR), ইউএন উইমেন (UN Women) এবং ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রামের (WFP) উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প সরেজমিনে পরিদর্শন করে এবং মানবিক সহায়তা আরও জোরদারের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছে।
তিনি বিশেষ তথ্য দিয়ে জানান, চলতি মাসের (জুলাই ২০২৬) শুরুতে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরকালে নিজে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন। এর ফলে রোহিঙ্গাদের জন্য তুরস্কের মানবিক ও কৌশলগত সহায়তা আরও অনেক বাড়বে বলে সরকার গভীরভাবে আশা করছে।
প্রধানমন্ত্রী আরও মনে করিয়ে দেন, গত সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের দ্রুত ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের উদ্যোগে একটি হাই-প্রোফাইল উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল। ভবিষ্যতেও জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের মেগা উদ্যোগের মাধ্যমে বিশ্বজনমতকে আরও কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করার প্রচেষ্টা চলমান থাকবে।
আন্তর্জাতিক আদালতে গাম্বিয়ার মামলায় নৈতিক সমর্থন বহাল
রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত অতীতের জেনোসাইডের বিচার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্ট করে বলেন, সরকার রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণ বিবেচনায় নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। এই লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ICJ) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার দায়ের করা ঐতিহাসিক মামলার প্রতি বাংলাদেশের পূর্ণ আইনি ও নৈতিক সমর্থন অব্যাহত রয়েছে।







