নিরাপত্তা কৌশল যেন জনগণ থেকে দূরে ঠেলে না দেয়- প্রধানমন্ত্রী
 

 

নিরাপত্তা কৌশল যেন জনগণ থেকে দূরে ঠেলে না দেয়- সেনানিবাসে ৫১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্‌যাপনে প্রধানমন্ত্রী

রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের নিরাপত্তা বলয় বা কৌশল যেন কোনোভাবেই সাধারণ জনগণ থেকে দেশের নির্বাচিত সরকারপ্রধানকে বিচ্ছিন্ন বা দূরে ঠেলে না দেয়, সেদিকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকার জন্য প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট (পিজিআর)-এর কর্মকর্তাদের প্রতি কড়া নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

রবিবার (৫ জুলাই ২০২৬) ঢাকা সেনানিবাসস্থ পিজিআর সদর দপ্তরে বিশেষায়িত এই এলিট বাহিনীর ৫১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান। প্রতি বছর ৫ জুলাই স্বাধীন বাংলাদেশে প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা ও প্রটোকল নিশ্চিত করতে গঠিত বিশেষায়িত এই বাহিনীর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হয়।

“জনগণের ভালোবাসা ও বিশ্বাসের ওপর আমার আস্থা” — প্রধানমন্ত্রী

নিরাপত্তা ও জনসম্পৃক্ততার ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন:

“একটি গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান হিসেবে আমি সব সময় জনগণের বিশ্বাস এবং ভালোবাসার ওপর আমার আস্থা ও নির্ভরতা বজায় রাখতে চাই। সুতরাং, আপনাদের নিরাপত্তা কৌশল এমনভাবে বিন্যাস করা জরুরি, যাতে জনগণ নিজেদেরকে সরকারপ্রধান থেকে বিচ্ছিন্ন মনে না করেন। নিরাপত্তা যেন জনগণের সাথে দূরত্ব তৈরির হাতিয়ার না হয়, সেদিকে আপনাদের বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে।”

তিনি মনে করিয়ে দেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে কঠোর স্ক্রিনিং, বিশেষ বাছাই ও উচ্চতর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সদস্যদের এই বিশেষায়িত রেজিমেন্টে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাই পেশাদারিত্ব, আনুগত্য এবং শৃঙ্খলার সমন্বয়ে পিজিআর সদস্যরা তাঁদের ওপর অর্পিত পবিত্র দায়িত্ব দক্ষতার সাথে পালন করবেন—এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা।

গৌরবের ‘ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড’ পুরস্কার পাচ্ছে পিজিআর

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত আনন্দের সাথে ঘোষণা করেন যে, দীর্ঘদিনের অনন্য সুশৃঙ্খলা, বিশ্বস্ততা ও কর্তব্যপরায়ণতার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি স্বরূপ ‘প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট’ (PGR) চলতি বছর মর্যাদাপূর্ণ ‘ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড’ (National Standard) পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছে।

তিনি বলেন, “একটি এলিট বাহিনী হিসেবে এটি অবশ্যই আপনাদের জন্য অত্যন্ত গৌরবের ও আনন্দের। যে কোনো কঠিন ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও পিজিআর-এর ইস্পাতকঠিন দায়িত্ববোধ সব মহলে প্রশংসিত হয়েছে।”

সাইবার ও ড্রোন যুদ্ধের বহুমাত্রিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ

বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতি ও আধুনিক যুদ্ধকৌশলের পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন প্রচলিত চ্যালেঞ্জের বাইরেও আর্থ-সামাজিক, ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ বিকাশের ফলে বহুমাত্রিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী কড়া বার্তা দিয়ে বলেন:

“বর্তমানে সাইবার যুদ্ধ (Cyber Warfare), ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার, ড্রোন যুদ্ধ কিংবা তথ্যযুদ্ধ—এসব নতুন নতুন ক্ষেত্রগুলোকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। এই বহুমাত্রিক আধুনিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুধুমাত্র পিজিআরই নয়, সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিটি ইউনিটকে আধুনিক ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা জরুরি। সশস্ত্র বাহিনীর পাশাপাশি পিজিআর কিংবা এসএসএফ (SSF)-এর মতো সফিস্টিকেটেড এলিট বাহিনীগুলোকে আরও আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে সরকার মেগা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।”

শহীদ জিয়াউর রহমান ও ১৯৮১ সালের ৩০ মে’র রক্তক্ষয়ী স্মৃতিচারণ

বক্তব্যের শুরুতে আবেগঘন কণ্ঠে পিজিআর-এর ইতিহাস ও নিজের জীবনের সবচেয়ে শোকাবহ অধ্যায় তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি স্মরণ করেন যে, ১৯৭৫ সালের ৫ জুলাই প্রথমে ‘প্রেসিডেন্ট দেহরক্ষী ইউনিট’ নামে এই রেজিমেন্ট আত্মপ্রকাশ করলেও, পরবর্তীকালে তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ১৯৭৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর এটিকে পুনর্গঠন করে ‘প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট’ (PGR) হিসেবে নামকরণ করেন।

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের স্মৃতিচারণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন:

“আমার পিতা, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক ও সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাত বরণের সেই কালো রাতের কথা আজ মনে পড়ছে। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে রক্ষা করতে গিয়ে কর্তব্যরত পিজিআর-এর বেশ কয়েকজন বীর সদস্যও নির্মমভাবে শাহাদাত বরণ করেছিলেন। দায়িত্ব পালনের সময় জীবন উৎসর্গের মাধ্যমে রাষ্ট্রপ্রধানের প্রতি অটল আনুগত্যের যে নজির তাঁরা স্থাপন করেছেন, তা পিজিআর-এর ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে।”

শহীদ পরিবারগুলোর সাথে কুশল বিনিময় ও চারা রোপণ

ঢাকা সেনানিবাসের পিজিআর সদর দপ্তরে পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রীকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। এরপর তিনি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অফিশিয়াল কেক কাটেন এবং পিজিআর চত্বরে একটি সুদৃশ্য স্মারক গাছের চারা রোপণ করেন।

অনুষ্ঠানের সবচেয়ে মানবিক ও আবেগঘন মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সাথে কর্তব্যরত অবস্থায় শাহাদাত বরণ করা পাঁচ পিজিআর সদস্যের পরিবারের সদস্যদের কাছে টেনে নেন। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে তাঁদের খোঁজখবর নেন, বর্তমান পরিস্থিতি শোনেন এবং তাঁদের সাথে আন্তরিক কুশল বিনিময় করেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top