রাজধানী ঢাকার বুক চিরে ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও ফেনীসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক, ফ্লাইওভার এবং জনবহুল এলাকায় হঠাৎ করেই আরবি হরফে কালিমাখচিত সাদা ও কালো রঙের রহস্যময় পতাকা উড়তে দেখা গেছে। কোনো সুনির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়া দেশজুড়ে একযোগে এই পতাকা টাঙানো এবং মোটরসাইকেল শোডাউনের ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মূলধারার সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।
শনিবার (২৭ জুন ২০২৬) সকাল থেকে রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মিরপুর, গাবতলী ও যাত্রাবাড়ীসহ দেশের একাধিক জেলা থেকে এই পতাকা ওড়ানোর খবর পাওয়া গেছে। তবে কারা, কী উদ্দেশ্যে রাতারাতি এই পতাকাগুলো লাগিয়ে গেছে—সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য এখনও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে নেই।
মোহাম্মদপুর থেকে যাত্রাবাড়ী—সর্বত্রই রহস্যময় পতাকা
শনিবার সকালে সরেজমিনে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের শিয়া মসজিদ মোড়, তাজমহল রোড ও জেনেভা ক্যাম্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার দুই পাশের বৈদ্যুতিক খুঁটি ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সামনে সাদা-কালো পতাকা উড়ছে।
তাজমহল রোডের লার্জ ফার্মা এবং মিস্টার বেকার আউটলেটের সামনে টাঙানো পতাকার বিষয়ে দায়িত্বরত নিরাপত্তাকর্মী ও কর্মচারীদের সাথে কথা বললে তাঁরা জানান, কখন কারা এই পতাকাগুলো টাঙিয়ে দিয়ে গেছে, তা তাঁরা দেখেননি।
মোহাম্মদপুর ছাড়াও গাবতলী টেকনিক্যাল মোড় থেকে মিরপুর-১ অভিমুখে যাওয়ার প্রধান সড়ক, যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের প্রবেশমুখ এবং শনির আখড়া এলাকায় একই ধরনের শত শত পতাকা উড়তে দেখা গেছে। রাজধানীর প্রবেশমুখ সাভারের বিভিন্ন সড়কেও এই পতাকার আধিক্য চোখে পড়েছে।
মোটরসাইকেল শোডাউন ও হাটহাজারীতে বিক্ষোভ
শুধু পতাকা টাঙানোই নয়, এই পতাকা হাতে একদল যুবককে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে শোডাউন করতেও দেখা গেছে। গত শুক্রবার জুমার নামাজের পর রাজধানীর কাকরাইল মসজিদ-সংলগ্ন সড়ক দিয়ে প্রায় অর্ধশত যুবকের একটি দল মোটরসাইকেলের বহর নিয়ে এই আরবি লেখা সাদা পতাকা উঁচিয়ে শোডাউন দেয়। তারা অত্যন্ত দ্রুত গতিতে গুলিস্তানের দিকে চলে যাওয়ায় তাদের সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে এই শোডাউনের ভিডিও ও ছবি টিকটক এবং ফেসবুকে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই পতাকার সূত্রপাত মূলত গত ১৯ জুন (শুক্রবার)। যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভার থেকে পুলিশ বা সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক এই পতাকা খুলে নেওয়ার প্রতিবাদে চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে একটি বড় ধরনের প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। সেই মিছিলেও এই সাদা-কালো পতাকা প্রদর্শন করা হয়েছিল। এর পর থেকেই চট্টগ্রাম, পাবনা, যশোর ও ফেনীসহ বিভিন্ন জেলায় একযোগে এই পতাকা লাগানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জে লাইটপোস্টে পতাকা লাগালো মাদ্রাসা ছাত্ররা
নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা সংযোগ সড়কের শিবু মার্কেট এলাকার ওভারপাসের বৈদ্যুতিক খুঁটিতে সড়কের দুই পাশে প্রায় একশটিরও বেশি এই সাদা পতাকা লাগানো হয়েছে।
শিবু মার্কেট এলাকার এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “গত বুধবার গভীর রাতে মাদ্রাসার কিছু ছাত্র এসে আরবি হরফে কালিমাখচিত এই সাদা পতাকাগুলো সড়কের মাঝখানের লাইটপোস্টে টাঙিয়ে দিয়ে যায়।” সড়ক পরিচ্ছন্নতাকর্মীরাও গভীর রাতে মাদ্রাসা ছাত্রদের এই পতাকা লাগানোর তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
“আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে”: পুলিশ প্রশাসন
হঠাৎ করে দেশজুড়ে এই পতাকা ওড়ানো এবং যুবকদের শোডাউনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখছে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান বলেন:
“বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে এবং অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। কোনো উগ্রপন্থী বা নিষিদ্ধ সংগঠন এর পেছনে রয়েছে কি না এবং এর নেপথ্যে কোনো অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির উদ্দেশ্য আছে কি না, তা খতিয়ে দেখে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ডিএমপির মোহাম্মদপুর জোনের এডিসি জুয়েল রানা জানান, তাঁরা সবেমাত্র বিষয়টি শুনেছেন এবং মাঠপর্যায়ে পুলিশ পাঠিয়ে বিস্তারিত খোঁজখবর নিচ্ছেন।
অন্যদিকে, নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সী বলেন, “বিষয়টি আমার নলেজে ছিল না। আমি এখনই খোঁজখবর নিয়ে দেখছি।” জেলার অতিরিক্ত পুলিশ এসপি (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী বলেন, “ফুটবল বিশ্বকাপ চলার কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন দেশের পতাকা ওড়ানোর বিষয়টি দেখা যাচ্ছে। তবে সাদা কাপড়ে কালিমা লেখা এই ধরনের পতাকা লাগানোর বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে এবং দ্রুতই এর পেছনের কুশীলবদের শনাক্ত করা হবে।”







