প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের ঐতিহাসিক চীন সফর শেষে ঢাকা ও বেইজিংয়ের মধ্যে ভূ-রাজনীতি, কূটনীতি ও নদী ব্যবস্থাপনায় এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। উত্তরবঙ্গের কোটি মানুষের স্বপ্নের ‘তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প’ (Teesta Mega Plan) বাস্তবায়নে চীন আনুষ্ঠানিকভাবে তার সক্ষমতা অনুযায়ী পূর্ণ সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। একই সাথে দুই দেশের সম্পর্ককে কৌশলগত অংশীদারিত্ব থেকে আরও উচ্চপর্যায়ে উন্নীত করতে কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে ‘২+২ সংলাপ’ চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার (২৬ জুন ২০২৬) বেইজিংয়ের ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’-এ চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঐতিহাসিক শীর্ষ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে দুই দেশের পক্ষ থেকে এক অভূতপূর্ব ১৫ দফা যৌথ ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা হয়।
১৫ দফা যৌথ ঘোষণার মূল ও কৌশলগত দিকসমূহ:
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও বেইজিংয়ের কূটনৈতিক সূত্র অনুযায়ী, এই ১৫ দফা যৌথ ঘোষণায় দুই দেশের আগামী কয়েক দশকের সম্পর্কের রূপরেখা ও অভিন্ন ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা হয়েছে:
১. তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পানি কূটনীতি (দফা ৮):
ঘোষণাপত্রে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, উজান থেকে আসা পানির সঠিক ব্যবহার ও নদী ভাঙন রোধে তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে (TRCMRP) চীন কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা দেবে। প্রকল্পটির চূড়ান্ত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (Feasibility Study) দ্রুত সম্পন্ন করতে দুই দেশের বিশেষজ্ঞরা যৌথভাবে মাঠে নামবেন। এছাড়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নদী খননেও চীন প্রযুক্তি সরবরাহ করবে।
২. ‘২+২ সংলাপ’ ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা (দফা ৩ ও ৯):
বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ককে সামরিক ও কৌশলগত দিক থেকে সুদৃঢ় করতে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সংলাপ চালু করা হবে। পাশাপাশি, দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে ভারসাম্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে দুই দেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে ‘২+২ সংলাপ’ চালুর সম্ভাবনা যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন ও সামরিক প্রশিক্ষণেও দুই দেশ একসাথে কাজ করবে।
৩. নতুন নির্বাচনের অভিনন্দন ও চীনের সমর্থন (দফা ২):
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ায় এবং নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নতুন সরকার গঠিত হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ব্যক্তিগতভাবে অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। চীন বর্তমান নির্বাচিত সরকারের শাসনব্যবস্থা ও উন্নয়ন কার্যক্রমের প্রতি বেইজিংয়ের অনমনীয় সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।
৪. ‘এক চীন নীতি’ ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা (দফা ৪):
বাংলাদেশ পুনরায় ‘এক চীন নীতি’র প্রতি তার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে এবং তাইওয়ানের স্বাধীনতার যেকোনো প্রচেষ্টার তীব্র বিরোধিতা করেছে। পক্ষান্তরে, চীনও বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় যেকোনো বৈশ্বিক চাপ বা হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে ঢাকার পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
৫. মোংলা বন্দর ও চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল (দফা ৬):
বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে বাংলাদেশের শতভাগ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ায় চীনকে ধন্যবাদ জানানো হয়। একই সাথে মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ এবং চট্টগ্রামে বিশেষায়িত ‘চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল’ উন্নয়ন প্রকল্প দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে উভয় দেশ একমত হয়েছে।
৬. ব্রিকস ও সাংহাই সংস্থায় বাংলাদেশকে সমর্থন (দফা ১১):
আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে বহুজাতিক জোট ব্রিকস (BRICS) এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (SCO)-এর অংশীদার বা সদস্য হওয়ার জন্য বাংলাদেশের যে আবেদন, তাতে চীন তার পূর্ণ ও সরাসরি রাজনৈতিক সমর্থন দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
৭. রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মধ্যস্থতা (দফা ১৩):
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সৃষ্ট সহিংসতায় বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিরাপদ ও দ্রুত প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে চীন তার ‘গঠনমূলক ও সক্রিয়’ ভূমিকা ও বন্ধুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতা বজায় রাখবে বলে আশ্বস্ত করেছে।
“সম্পর্কের নতুন শুভ সূচনা”
চার দিনের এই মেগা সফর শেষে বেইজিংয়ের স্থানীয় সময় বিকাল ৫টায় (বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টা) ২৪ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলসহ বিশেষ বিমানে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ১৫ দফা যৌথ ঘোষণা কেবল একটি দ্বিপাক্ষিক কাগজ নয়, বরং এটি ২০২৬ সালের মেগা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ‘নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যতের চীন-বাংলাদেশ সম্প্রদায়’ গড়ে তোলার এক ঐতিহাসিক রোডম্যাপ। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে এক নতুন শক্তিশালী অভিভাবকত্ব নিশ্চিত করল।







