জাতীয় সংসদে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে বসুন্ধরা গ্রুপের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলার অগ্রগতি এবং দলমতনির্বিশেষে প্রভাবশালী মহলের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা ও তোপ দেগেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ।
আজ বৃহস্পতিবার (২৫ জুন ২০২৬) স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে শুরু হওয়া অধিবেশনে হাসনাত আব্দুল্লাহ প্রশ্ন তোলেন—বসুন্ধরা গ্রুপের অর্থ পাচার ও দুর্নীতি মামলার বিষয়ে সরকারের কোনো ‘আন্ডারটেবিল’ বা পর্দার আড়ালের সমঝোতা হয়েছে কি না। যদি না হয়ে থাকে, তবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আইনি বাধা কোথায়, তা জনগণের সামনে স্পষ্ট করার দাবি জানান তিনি।
“সদর্পে দেশে ফিরেছে সুবহানের পুত্র”: আনভীরের আগমন নিয়ে প্রশ্ন
বাজেট বক্তৃতায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের দাবি তুলে ধরে হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন:
“আমরা দেখেছি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বসুন্ধরার মালিকের পুত্র দেশে ঢোকার সাহস পায়নি। আমরা দেখেছি, আনভীর দেশে ঢোকার সাহস পায়নি। কিন্তু এই সরকার নির্বাচিত হয়ে আসার পরে আমরা দেখেছি, সদর্পে এই সুবহানের পুত্র, এই ধর্ষক, দেশে ঢুকেছে। আমরা জানতে চাই, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় দুর্নীতি দমন কমিশন বসুন্ধরার বিরুদ্ধে যে মামলা করেছে, সেই মামলার কী অগ্রগতি হয়েছে? কোনো আন্ডারটেবিল সমঝোতা হয়েছে কি না, বাংলাদেশের মানুষের সামনে তা প্রকাশ করতে হবে।”
তিনি অভিযোগ করেন, এই করপোরেট গ্রুপটি বিদেশে টাকা পাচার করেছে, মানুষের সম্পদ দখল করেছে এবং নিজস্ব মিডিয়া হাউজগুলোর মাধ্যমে বিগত আওয়ামী লীগের গুম, খুন ও হত্যাকে বৈধতা দিয়েছে। তাদের খুঁটির জোর কোথায়, তা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান তিনি।
“প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দেশদ্রোহী ফ্রেমিং করা মিডিয়ার পরামর্শক সরকারি দলের এমপিরা”
বসুন্ধরা গ্রুপের মিডিয়া ও পরামর্শক প্যানেলে বর্তমান সরকারি দলের (বিএনপি) সংসদ সদস্যদের যুক্ত থাকার অভিযোগ এনে হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন:
“সরকারি দলের অনেকে আমাদের কাছে এসে দুঃখ প্রকাশ করেন। তাঁদের দলের কিছু মানুষ বসুন্ধরার পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন। যে মিডিয়া একসময় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ‘দেশদ্রোহী’ হিসেবে ফ্রেমিং করেছে, সেই মিডিয়ার পরামর্শক হিসেবে এবং বসুন্ধরা গ্রুপে সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের অনেকেই এখন যুক্ত আছেন।”
তিনি আরও যোগ করেন, যারা ক্ষমতার সুবিধা নিয়ে করপোরেটদের পক্ষে কিংবা ফ্যাসিবাদের পক্ষে ‘বয়ান উৎপাদন’ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সুবিচার নিশ্চিত করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী প্রতিশোধপরায়ণ হননি, সেটির সাধুবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, “প্রতিশোধপরায়ণ না হওয়া আর সুবিচার নিশ্চিত না করা এক বিষয় নয়।”
পাচারের ২৮ লাখ কোটি টাকা ও ঋণখেলাপিদের সাথে সংসদ শেয়ারে লজ্জা
অর্থনৈতিক শ্বেতপত্রের তথ্য উল্লেখ করে এনসিপির এই সংসদ সদস্য বলেন, দেশ থেকে ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। যারা পাচার করেছে, তারা এখন দেশে বুক ফুলিয়ে ঘুরছে। ব্যাংক দখলকারী ও ঋণখেলাপিদের কঠোর শাস্তি দাবি করে তিনি বলেন:
“আমরা লজ্জা পাই একই সংসদ একসাথে শেয়ার করার জন্য। কারণ, তারা জনগণের টাকা মেরে, ব্যাংক থেকে তুলে নিয়ে ঋণখেলাপি হয়ে আবার জনগণের প্রতিনিধিত্ব করতে আসে। জনগণকে স্পষ্ট করতে হবে যে জনগণের টাকা নিয়ে এই বিলাসিতা আর চলবে না।”
বাজেট, কর্মসংস্থান ও করনীতির কড়া সমালোচনা
প্রস্তাবিত বাজেটের বিভিন্ন অসঙ্গতি তুলে ধরে অর্থমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, “আপনি একই সাথে বলছেন, মাছ মুচমুচে করে ভাজবেন, আবার বলছেন তেলটা কম দেবেন। এই স্ববিরোধী অবস্থান সাধারণ মানুষের কাছে স্পষ্ট নয়।” নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দোকানে কর আরোপের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এর দায় শেষ পর্যন্ত ক্রেতাকেই নিতে হবে। এছাড়া ৭.৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি কীভাবে কমানো হবে এবং এনবিআরের সক্ষমতা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে সরকারকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “বিএনপি পাঁচ বছরে এক কোটি চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সে হিসাবে এই চার মাসে ছয় লাখ কর্মসংস্থান হওয়ার কথা। আদৌ কি ছয় লাখ কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয়েছে? যদি হয়ে থাকে, তবে সেসব কর্মসংস্থান কোথায়?”
বক্তৃতার শেষাংশে একজন প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কথা বলায় একজন সম্পাদককে জেলে নেওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, সংসদ সদস্যরাও এখন মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় পান; কারণ তাঁদের এলাকার উন্নয়ন বাজেট বন্ধ করে দেওয়ার শঙ্কা থাকে।







