বিদ্যুৎ ক্যাপাসিটি চার্জ ইচ্ছা করলেই বাতিল করা যাচ্ছে না- জ্বালানি মন্ত্রী
 

 

বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জ ইচ্ছা করলেই বাতিল করা যাচ্ছে না, আগের লুটপাটের বোঝা টানতে হচ্ছে: জ্বালানি মন্ত্রী

বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিতর্কিত ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ (কেন্দ্র ভাড়া) বাতিল ইস্যুতে সরকারের চরম আইনি ও কৌশলগত সীমাবদ্ধতার কথা অকপটে স্বীকার করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি দেশবাসীর উদ্দেশে বলেছেন, “আমার অবস্থাটাও আপনাদের বুঝতে হবে। আমি যদি আজ জোর করে ক্যাপাসিটি চার্জ বন্ধ করতে চাই, তবে তারা দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ করে দেবে। এর ফলে দেশে আবারও তীব্র বিদ্যুৎ সংকট সৃষ্টি হবে।”

শুক্রবার (১২ জুন ২০২৬) বিকেল ৩টায় রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অর্থ মন্ত্রণালয় আয়োজিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট-উত্তর সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন তীক্ষ্ণ প্রশ্নের জবাবে জ্বালানি মন্ত্রী এসব কথা বলেন। অর্থ সচিব ড. মো. খায়রুজ্জামান মজুমদারের সঞ্চালনায় এই হাইপ্রোফাইল সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

বিনিয়োগকারীদের পক্ষে চুক্তি, হাত-পা বাঁধা সরকারের

ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে দেশজুড়ে চলা তীব্র সমালোচনার জবাবে জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, “ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে এবং আমি নিজে প্রথম দিন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই এটি নিয়ে বসেছিলাম। মূলত একসময় বড় বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করতে, প্রজেক্টগুলোকে ‘ব্যাংকেবল’ বা ব্যাংক ঋণযোগ্য করতে এবং গ্যারান্টির ভিত্তিতে দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্র আনতেই এই ব্যবস্থার চল হয়েছিল। কিন্তু বিগত সরকার বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর সঙ্গে যে চুক্তিগুলো করেছে, সেগুলো এতটাই ওয়ান-সাইডেড বা একপাক্ষিক এবং বিনিয়োগকারীদের পক্ষে করা হয়েছে যে সেখানে বর্তমান সরকারের পক্ষে আইনি লড়াই করার মতো কিছুই রাখা হয়নি।”

তিনি আরও জানান, বর্তমান অন্তর্বর্তী/নতুন সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের সঙ্গে আলোচনা করলেও তারা ক্যাপাসিটি চার্জ ছাড়তে স্পষ্ট অস্বীকৃতি জানিয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকরা মন্ত্রীকে জানিয়েছেন, ক্যাপাসিটি চার্জ হঠাৎ বন্ধ করে দিলে অর্থায়নকারী ব্যাংকগুলো তাদের সমস্ত লোন অবিলম্বে ফেরত চাইবে, যা পরিশোধ করা তাদের পক্ষে অসম্ভব। আর এই চার্জ না পেলে তারা বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা করতে পারবে না।

৫৬ হাজার কোটি টাকার বকেয়া ও সরকারি কেন্দ্রের অবহেলা

সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানি মন্ত্রী বিগত সরকারের নীতিগত দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে বলেন, দেশের সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর অনেকগুলোরই প্রয়োজনীয় মেরামত ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি। সেগুলোকে ইচ্ছাকৃতভাবে বসিয়ে রেখে চড়া দামে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনা হয়েছে। এর ফলে বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকার বিশাল বকেয়া তৈরি হয়েছে। মন্ত্রী বলেন, “আপনাদের বুঝতে হবে, আগের সরকার এই আত্মঘাতী ব্যবস্থাগুলো করে গেছে। আমরা এখন কেবল তাদের রেখে যাওয়া ঋণের বোঝা বহন করছি।”

লুটপাটের প্রমাণ: গুদামে পড়ে আছে আড়াই লাখ মিটার, সাবস্টেশনের নামে টুইন টাওয়ার

বক্তব্যের সপক্ষে জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু দুটি চাঞ্চল্যকর উদাহরণ দেন:

  • পল্লি বিদ্যুতায়নের মিটার কেলেঙ্কারি: পল্লি বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (REB) ৫ লাখ ডিজিটাল মিটার ক্রয়ের একটি প্রকল্পে গত ৩ বছরে মাত্র ৬৫টি মিটার স্থাপন করা সম্ভব হয়েছে! অথচ আড়াই লাখ মিটার ইতিমধ্যেই দেশে এসে গুদামে পড়ে নষ্ট হচ্ছে। এর মধ্যেই বাকি আড়াই লাখ মিটারও পাঠানোর জন্য আগের বোর্ড থেকে জাহাজীকরণের (Shipment) আদেশ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন সরকার যদি চুক্তি বাতিল করে, তবে আন্তর্জাতিক আদালতে গেলে বিদেশি সরবরাহকারী কোম্পানিই জিতবে, কারণ সরকারি বোর্ডই তাদের মালামাল পাঠাতে বলেছিল। এভাবেই আইনি ফাঁদে দেশ থেকে টাকা বের করে নেওয়া হয়েছে।

  • ডিপিডিসির প্রকল্প ও সুইমিং পুল: ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির (ডিপিডিসি) ২০৪০ সাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য একটি আন্ডারগ্রাউন্ড কেবল প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। সেখানে ৬৫টি সাবস্টেশন নির্মাণের কথা থাকলেও প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার মুখে মাত্র ৩৮টি স্থাপন করা হয়েছে। অথচ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যের বাইরে গিয়ে শাহবাগের পেছনে ডিপিডিসির বিশাল ‘টুইন টাওয়ার’ নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে আন্তর্জাতিক মানের সুইমিং পুল, আধুনিক জিমসহ বিলাসবহুল সুবিধা রাখা হয়েছে। অথচ যে প্রতিষ্ঠানটি এটি করেছে, তারা নিজেরা কোনো মুনাফা করে না, লোকসান হলে সরকারকেই ভর্তুকি দিতে হয়।

লুটপাটের প্যাকেজ সংস্কারে সময় চান মন্ত্রী

জ্বালানি মন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিগত সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কোনো অংশের কাজ ৫০ শতাংশ, কোনোটির ৬০ শতাংশ, আবার কোনোটির মাত্র ৩০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। এখন মাঝপথে এগুলো সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিলে ইতোমধ্যে ব্যয় হওয়া হাজার হাজার কোটি টাকা পুরোটাই অপচয় হবে। আবার বিপুল লোকসান দিয়ে এগুলো চালিয়ে নেওয়াও সরকারের জন্য কঠিন।

তিনি দেশবাসী ও গণমাধ্যমের উদ্দেশ্যে বলেন, “লুটপাট করে আমাদের জন্য যে ভয়াবহ ‘প্যাকেজগুলো’ রেখে যাওয়া হয়েছে, সেগুলো এখন আমাদের অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সমাধান করতে হচ্ছে। আমরা মাত্র কয়েক মাস আগে দায়িত্ব নিয়েছি। এত বড় বিপর্যয় ও জঞ্জাল রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়, এতে কিছুটা সময় লাগবে। তাই আপনাদের কাছে আমরা কিছুটা সময় চাইছি, যেন দেশের ক্ষতি না করে এগুলো সঠিকভাবে সমাধান করতে পারি।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top