বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে (বিজিবি) এক প্রকার “নতজানু” করে রাখার কারণে সীমান্তে যথাযথ প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি বলে তীব্র সমালোচনা ছিল। তবে গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় এক দৃশ্যমান ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) যেকোনো অন্যায্য ও আগ্রাসী পদক্ষেপের মুখে বিজিবি এখন পাল্টা চোখ রাঙাচ্ছে এবং দেশের বিভিন্ন সীমান্তে ভারতীয় বাহিনীর ‘পুশইন’ (জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া) করার সব রকম চেষ্টাকে শক্ত হাতে ব্যর্থ করে দিচ্ছে।
সম্প্রতি লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, নওগাঁ ও যশোরসহ দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় বিজিবির কঠোর অবস্থান এবং স্থানীয় জনসাধারণের সক্রিয় সহযোগিতায় বিএসএফের এসব অবৈধ চেষ্টা সফলভাবে প্রতিহত হয়েছে।
১. পাটগ্রামে এক ভারতীয় নাগরিককে পুশইনের চেষ্টা ব্যর্থ
লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার সাপ্পারবাড়ি সীমান্তে শনিবার দুপুরে ভারতীয় ১৫৬ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের দাওয়ারীকামার ক্যাম্পের সদস্যরা একজন ভারতীয় নাগরিককে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। বিজিবির কালিরহাট বিওপি (BOP) সূত্র জানায়, দুপুর ১২টার দিকে ওই ব্যক্তিকে পুশইনের চেষ্টা করা হলে বিজিবির টহল দল তাত্ক্ষণিকভাবে তীব্র বাধা দেয়। বিজিবির অনড় অবস্থানের মুখে বিএসএফ সদস্যরা পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং ওই ব্যক্তিকে নিয়ে ভারতের অভ্যন্তরে ফিরে যায়। বর্তমানে ওই ব্যক্তি সীমান্তের জিরো লাইনের ভারতীয় অংশে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। পাটগ্রাম সীমান্তে বিজিবির নায়েব সুবেদার আব্দুল মাজেদ জানান, পুশইনের চেষ্টা হওয়া মাত্রই কঠোর প্রতিবাদ জানানো হচ্ছে এবং সীমান্তজুড়ে টহল ও অতিরিক্ত নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
২. পঞ্চগড়ে ১০ জনকে নিয়ে ৩০ ঘণ্টার টানটান উত্তেজনা
পঞ্চগড় সদর উপজেলার বড়বাড়ি সীমান্তে নারী, শিশু ও পুরুষসহ মোট ১০ জনকে পুশইনের চেষ্টা ঘিরে প্রায় ৩০ ঘণ্টা ধরে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। শুক্রবার ভোর থেকে এই ১০ জন অসহায় মানুষ ভারতীয় শূন্যরেখায় (জিরো লাইনে) খোলা আকাশের নিচে অনিরাপদ অবস্থায় থমকে আছেন। বিজিবি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে—আইনগত প্রক্রিয়া ও সঠিক পরিচয় যাচাই ছাড়া কাউকে কোনোভাবেই বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। এই অচলাবস্থা নিরসনে বিজিবি-বিএসএফের মধ্যে একাধিক পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সমাধান আসেনি। তবে শূন্যরেখায় দীর্ঘ সময় ধরে অনাহারে থাকা এই মানুষগুলোর প্রতি মানবিক বিবেচনা থেকে বিজিবির পক্ষ থেকে শুকনো খাবার সরবরাহ করা হয়েছে।
৩. নওগাঁয় শক্ত অবস্থানের মুখে ১৭ জনকে ফিরিয়ে নিল বিএসএফ
নওগাঁর সাপাহার সীমান্তে ১৭ জন নারী, পুরুষ ও শিশুকে পুশইনের আরেকটি বড় চেষ্টা সফলভাবে নস্যাৎ করে দিয়েছে বিজিবি। বিজিবির শক্ত ও আপসহীন অবস্থানের কারণে দীর্ঘ ১৯ ঘণ্টা দেশের জিরো লাইনে আটকে থাকার পর শেষ পর্যন্ত গভীর রাতের আঁধারে বিএসএফ সদস্যরা তাদের ভারতের অভ্যন্তরে ফেরত নিয়ে যেতে বাধ্য হয়। বিজিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়, মানবিক বিবেচনায় প্রথমে তাদের শূন্যরেখায় থাকতে দেওয়া হলেও বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত সুরক্ষার স্বার্থে কোনো ছাড় দেওয়া হয়নি।
৪. বেনাপোলে বিজিবি ও স্থানীয়দের যৌথ প্রতিরোধ
যশোরের বেনাপোল সীমান্তেও প্রায় ৮ থেকে ১০ জন ভারতীয় নাগরিককে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা চালায় বিএসএফ। তবে এবার কেবল বিজিবি নয়, তাদের সঙ্গে যোগ দেয় স্থানীয় সাধারণ মানুষও। বিজিবি ও স্থানীয় জনগণের যৌথ ও ইস্পাতকঠিন প্রতিরোধের মুখে বিএসএফের সেই পরিকল্পনা পুরোপুরি ভেস্তে যায় এবং শূন্যরেখায় অবস্থানরত ব্যক্তিদের ভারতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। স্থানীয় সূত্র জানায়, বেনাপোল সীমান্তের গ্রামবাসী এখন লাঠি ও টর্চ হাতে রাতেও সীমান্ত পাহারায় অংশ নিচ্ছেন।
বিজিবির ৪৯ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম এই বিষয়ে বলেন:
“আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে জোরপূর্বক পুশইন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সঠিক যাচাই-বাছাই ছাড়া কাউকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া আইনগতভাবে সম্পূর্ণ অবৈধ।”
সীমান্ত বিশ্লেষকদের মতামত ও সমন্বিত পরিস্থিতি
সীমান্ত বিশ্লেষকদের মতে, দেশের একাধিক সীমান্তে একযোগে একই ধরনের পুশইনের ঘটনা ঘটায় পরিস্থিতি নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই সংকট নিরসনে দুই দেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় নতুন করে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনা প্রয়োজন।
তবে বিজিবি সদর দফতর ও স্থানীয় কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করে বলা হয়েছে, তারা আন্তর্জাতিক আইন মেনেই দেশের সীমান্ত রক্ষায় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। যেকোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তজুড়ে টহল দ্বিগুণ করা হয়েছে এবং স্থানীয় জনগণের এই অভূতপূর্ব স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতা বিজিবির মূল শক্তি হিসেবে কাজ করছে।







