মধ্যপ্রাচ্যে রণতরী পাঠাল যুক্তরাষ্ট্র: তেহরানকে ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারি

সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলন শেষে ওয়াশিংটনে ফেরার পথে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে এক কঠোর সামরিক ও কূটনৈতিক অবস্থান ঘোষণা করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের একটি শক্তিশালী নৌবহর বা ‘আর্মাডা’ বর্তমানে ইরানের অভিমুখে যাত্রা করেছে। যদিও তিনি আশা প্রকাশ করেছেন যে এই বিশাল সামরিক শক্তি সরাসরি ব্যবহারের প্রয়োজন পড়বে না, তবে বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়ন এবং পারমাণবিক কর্মসূচি পুনরায় শুরুর বিষয়ে তিনি তেহরানকে নতুন করে সতর্ক করে দিয়েছেন। ট্রাম্পের মতে, এই নৌবহর মোতায়েনের মূল উদ্দেশ্য হলো ওই অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করা এবং ইরানের যে কোনো হঠকারী সিদ্ধান্তের ওপর নিবিড় নজরদারি বজায় রাখা।

মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন যে, বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন এবং বেশ কয়েকটি গাইডেড-মিসাইল ধ্বংসকারী জাহাজ আগামী কয়েক দিনের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় পৌঁছাবে। গত জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার পর যে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, তার প্রেক্ষাপটে এই অঞ্চলে মোতায়েন করা মার্কিন বাহিনীর সুরক্ষা নিশ্চিত করাই এই অভিযানের লক্ষ্য। সম্প্রতি এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে যাত্রা শুরু করা এই নৌবহরের পাশাপাশি ইরানি হামলা ঠেকাতে ওই অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে অতিরিক্ত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও মোতায়েন করার পরিকল্পনা রয়েছে পেন্টাগনের।

ইরানের অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, তাঁর কঠোর হুমকির মুখে ইরান প্রায় ৮৪০ জন বন্দির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। তিনি সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন যে, যদি ওই মানুষগুলোকে ফাঁসি দেওয়া হয়, তবে ইরানের ওপর এমন ভয়াবহ সামরিক আঘাত হানা হবে যা তারা আগে কখনো দেখেনি। ট্রাম্পের মতে, নির্ধারিত সময়ের মাত্র এক ঘণ্টা আগে মৃত্যুদণ্ড বাতিলের এই সিদ্ধান্তটি একটি ‘ভালো লক্ষণ’। তবে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ইরান যদি পুনরায় তাদের উচ্চমাত্রার পারমাণবিক কর্মসূচি শুরু করার চেষ্টা করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র কোনো দ্বিধা ছাড়াই আবারও তাদের স্থাপনাগুলোতে আঘাত হানবে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরানের কাছে বর্তমানে ৪৪০.৯ কেজি ইউরেনিয়াম রয়েছে যা ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ এবং এটি পর্যাপ্ত পরিমাণে সংস্কার করা গেলে অন্তত ১০টি পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্য যথেষ্ট।

অন্যদিকে, ইরানে গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া গণবিক্ষোভ এখন চরম আকার ধারণ করেছে। অর্থনৈতিক দুর্দশাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন দমনে সরকারের কঠোর অবস্থান দেশজুড়ে লাশের মিছিল দীর্ঘ করছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দেওয়া তথ্য মতে নিহতের সংখ্যা সাড়ে চার হাজার ছাড়িয়ে গেলেও ইরানি কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ দাবি করছেন যে এই সংখ্যা ৫ হাজারেরও বেশি, যার মধ্যে কয়েকশ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যও রয়েছে। বিক্ষোভকারীদের হতাহতের সঠিক সংখ্যা নিয়ে ধোঁয়াশা থাকলেও ট্রাম্প মন্তব্য করেছেন যে, নিহতের সংখ্যা যাই হোক না কেন, এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং অগ্রহণযোগ্য। মধ্যপ্রাচ্যের এই ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এখন বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top