শিক্ষাক্ষেত্রে ধারাবাহিক প্রশ্নপত্র ফাঁস ও দুর্নীতিকে কেন্দ্র করে ভারতের রাজধানী নতুন দিল্লিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক তরুণ আন্দোলন এখন এক নজিরবিহীন রূপ নিয়েছে। ভারতের প্রধান বিচারপতির বিতর্কিত মন্তব্যের প্রতিবাদে গড়ে ওঠা জেন-জি (Gen Z) তরুণদের প্ল্যাটফর্ম ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)-র নেতৃত্বে গত ২০ জুলাই পার্লামেন্ট অভিমুখে শুরু হওয়া বিক্ষোভ আন্দোলন এখন গোটা দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনলাইন মিম, কন্টেন্ট ও স্মার্টফোনে ধারণ করা লাইভ ফুটেজকে হাতিয়ার বানিয়ে নরেন্দ্র মোদি সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে সরব হয়ে উঠেছে দেশটির জি-প্রজন্ম। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা আল জাজিরা-র এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে তরুণদের এই অভূতপূর্ব রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিবাদের রূপরেখা।
‘টেলিভিশনে দেখাচ্ছি আমাদের বিপ্লব’: লাঠিচার্জ ও স্মার্টফোন প্রামাণ্যচিত্র
গত ২০ জুলাই লাখ লাখ তরুণের পার্লামেন্টমুখী বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশি লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস ও পেলেট গান ব্যবহারে শতাধিক শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হন। তবে দমন-পীড়নে দমে না গিয়ে তরুণরা সেদিনের প্রতিটি পুলিশি সহিংসতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশ্ববাসীর সামনে উন্মুক্ত করে দেন।
দিল্লির পার্লামেন্ট স্ট্রিটে ক্ষোভ প্রকাশ করে কিশোরী আন্দোলনকারী অবাংশিকা সিং আল জাজিরাকে বলেন:
“এখন দেশের সবাই শুধু এই একটি বিষয় নিয়েই কথা বলছে। আর কিছু না হোক, আমরা আমাদের বিপ্লব টেলিভিশনে সরাসরি দেখাচ্ছি। আজ পুরো দেশ আমাদের সাথে লাঠিচার্জের আঘাত ও কাঁদানে গ্যাসের জ্বালা অনুভব করছে। বছরের পর বছর ভিন্নমতকে অপরাধ বানানোর পর, এখন ইন্টারনেটে মোদিকে ঘৃণা করাটা যেন একটা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া প্রামাণ্যচিত্র ও ফুটেজে দেখা যায়:
-
মেটা চশমা পরিহিত পুলিশের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নজরদারি।
-
লাঠিচার্জ, পেলেট গান এবং নিরস্ত্র তরুণ-তরুণীদের ধাওয়া দিয়ে মারধর।
-
এক মায়ের সন্তানকে বাঁচানোর জন্য আকুল মিনতি ও কাঁদানে গ্যাস থেকে বাঁচার চেষ্টা করা ছাত্রকে পুলিশের পা দিয়ে ফেলে দেওয়া।
‘ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)’ এবং তরুণদের প্রধান ৩ দাবি
উল্লেখ্য, ভারতের প্রধান বিচারপতি সম্প্রতি আন্দোলনকারী তরুণদের আপত্তিকরভাবে ‘তেলাপোকা’ ও ‘পরজীবী’ বলে আখ্যায়িত করার পর জেন-জি প্রজন্ম ব্যঙ্গাত্মকভাবে তাদের রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের নাম দেয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)।
সিজেপির পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, সরকার যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের তিন দফা দাবি না মানবে, ততক্ষণ শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ অব্যাহত থাকবে:
১. প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অব্যবস্থাপনার দায়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অবিলম্বে পদত্যাগ।
২. আন্দোলনকারী কোনো শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা (Criminal charges) দায়ের না করা।
৩. প্রশ্নপত্র ফাঁস ও পরীক্ষা বাতিলের জেরে মানসিক চাপ সামলাতে না পেরে যেসব শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন, তাঁদের পরিবারকে ১ লাখ ৫ হাজার মার্কিন ডলার (প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা) ক্ষতিপূরণ দেওয়া।
“মোদি ভুল প্রজন্মের সাথে লাগতে এসেছেন”: মিম ও বিদ্রোহের ভাষা
সাংস্কৃতিক সমালোচক অনুরাগ মাইনাস ভার্মা আল জাজিরাকে বলেন, “তেলাপোকা আন্দোলনের আগেই বেনামি সামাজিক মাধ্যম অ্যাকাউন্টগুলোর তৈরি মিমে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জমা হচ্ছিল। এখন মোদিকে সরাসরি লক্ষ্য করে সমালোচনা করাটা কেবল গ্রহণযোগ্য নয়, বরং আকর্ষণীয় একটা ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
প্রতিবাদে অংশ নেওয়া ২০ বছর বয়সী তরুণী ইপশিতা গুলিয়ারি বলেন, “এই সরকার দেশের যুবসমাজের প্রতি কোনো দায়িত্ব পালন করছে না। মোদি ভুল প্রজন্মের সাথে লাগতে এসেছেন। ওনার মধ্যে প্রচুর ঔদ্ধত্য, কিন্তু কিশোর-তরুণরা এগুলো সহ্য করে না, ব্রো!”
একইভাবে ১৮ বছর বয়সী যশভি কুমার বলেন, “বিশৃঙ্খলা আর ট্রমার মাঝে এক হতে বিদ্রোহের একটা ভাষা দরকার। আমাদের জন্য সেই মানিয়ে নেওয়ার কাজটাই করছে মিম।”
প্যান-ইন্ডিয়া বিক্ষোভ: ছড়িয়ে পড়ছে সারা ভারতে
বিশ্লেষকদের মতে, মোদি ও তাঁর দল বিজেপির দীর্ঘ ১২ বছরের তথ্য-প্রযুক্তি (IT Cell) আধিপত্য ও অনলাইন প্রচারণার বিরুদ্ধে জেন-জি প্রজন্ম এক শক্তিশালী ডিজিটাল ও মাঠপর্যায়ের প্রতিরোধী প্রাচীর গড়ে তুলেছে।
দিল্লির যন্তর মন্তরের দিনরাত চলা এই ধর্ণার রেশ ধরে আন্দোলনের দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে ভারতের অন্যান্য প্রধান প্রধান শহরগুলোতে—
-
মুম্বাই ও বেঙ্গালুরু
-
পাটনা ও লখনউ
-
আইজল (উত্তর-পূর্ব ভারত)
সামাজিক মাধ্যম ও রাজপথ—উভয় মাধ্যমেই মোদি সরকারের ওপর চাপ দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে।
সূত্র- আলজাজিরা







