ভারতের রাজস্থানের জয়পুরে এক বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য রাখার ঠিক আগমুহূর্তে নির্মম শারীরিক হামলার শিকার হয়েছেন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা ও সমাজকর্মী অভিজিৎ দিপকে। সোমবার (১৫ জুন ২০২৬) জয়পুরের ঐতিহাসিক শহীদ স্মারকে আয়োজিত একটি শান্তিপূর্ণ সমাবেশে যোগ দিতে যাওয়ার সময় ভিড়ের মধ্য থেকে দুষ্কৃতকারীরা তাঁর ওপর এই হামলা চালায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই নজিরবিহীন মারধরের ভিডিও ইতিমধ্যে ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়েছে।
সমর্থকদের কাঁধ থেকে টেনে নামিয়ে একের পর এক চড়
প্রত্যক্ষদর্শী ও হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, সোমবার বিকেল ৩টায় জয়পুরের শহীদ স্মারকে নিট (NEET) পরীক্ষা ও সিবিএসই (CBSE) কেলেঙ্কারির প্রতিবাদে একটি শান্তিপূর্ণ সমাবেশের ডাক দিয়েছিলেন অভিজিৎ দিপকে। তিনি যখন অনুসারীদের কাঁধে চড়ে স্লোগান দিতে দিতে সভামঞ্চের দিকে এগোচ্ছিলেন, ঠিক তখনই ভিড়ের মধ্যে লুকিয়ে থাকা কিছু দুষ্কৃতকারী আকস্মিকভাবে তাঁর গলার স্কার্ফ ধরে টান দেয়। এরপর তাঁকে লক্ষ্য করে একের পর এক চড় মারা হয় এবং কাঁধ থেকে নিচে টেনে নামিয়ে মারধর করা হয়। আচমকা এই হামলায় সভাস্থলে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে সিজেপির তীব্র ক্ষোভ ও ‘তীব্র গরম’ কূটনীতি
এই বর্বরোচিত হামলার পর রাজস্থান সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা প্রকাশ করেছে ককরোচ জনতা পার্টি। সিজেপি-র রাজ্য মুখপাত্র অভিষেক জৈন বিট্টু স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের তীব্র সমালোচনা করে বলেন:
“এই হামলা যেভাবে ঘটেছে, তা পুলিশ এবং রাজস্থান সরকারের ভূমিকা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তোলে। সমাজবিরোধীদের কঠোরহস্তে থামানোর পরিবর্তে প্রশাসন নীরব ভূমিকা পালন করে পরিস্থিতিকে আরও খারাপ হতে দিয়েছে। এই আচরণ অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং এর সাথে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”
অন্যদিকে, দলটির জাতীয় মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা অভিযোগ করেন, রাজস্থানে জুন মাসের এই তীব্র ও অসহ্য গরমের মধ্যে ইচ্ছে করেই বিকেল ৩টায় সমাবেশের সময় নির্ধারণ করে দিয়েছিল প্রশাসন, যাতে সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা তীব্র দাবদাহে ভয় পেয়ে জড়ো হতে না পারে। কিন্তু সব বাধা উপেক্ষা করে মানুষ ঠিকই রাজপথে নেমেছে।
‘কাপুরুষরাই সহিংসতার পথ বেছে নেয়’, ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি
হামলার শিকার হওয়ার পর এক তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় অভিজিৎ দিপকে বলেন, “বিক্ষোভস্থলে প্রবেশের সময় কাপুরুষোচিতভাবে আমার ওপর হামলা চালানো হয়েছে। তবে তারা যত উসকানিই দিক না কেন, আমি বা আমার দলের কেউ কারও ওপর হাত তুলব না। কাপুরুষরাই কেবল সহিংসতার পথ বেছে নেয়। আমি কোনোভাবেই চুপ থাকব না।”
পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় তিনি আন্দোলনের মূল লক্ষ্য পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, “এগুলো আমাদের ভয় দেখানোর এবং মূল ইস্যু থেকে জনমনোযোগ সরিয়ে দেওয়ার সস্তা কৌশল। আমাদের একমাত্র ও প্রধান দাবি—ভারতে একের পর এক পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রশ্ন ফাঁস, অনিয়ম এবং এর জেরে শিক্ষার্থীদের ওপর হওয়া অন্যায় ও তাঁদের আত্মহত্যার দায় নিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে। আমাদের আন্দোলন শান্তিপূর্ণ এবং ভালোবাসার সাথেই এটি চলতে থাকবে।” একই সাথে হামলাকারী ও বিরোধীদের উদ্দেশ্য করে তিনি ‘গেট ওয়েল সুন’ (দ্রুত মানসিক আরোগ্য কামনা) বার্তা দেন।
তেলাপোকা যখন প্রতিরোধের প্রতীক: নেপথ্যে সিজেপি
উল্লেখ্য, ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP) মূলত একটি রাজনৈতিক ব্যঙ্গাত্মক ফ্রন্ট (Satirical Front) হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল। গত মে মাসে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি বিতর্কিত মন্তব্যের পর তীব্র ক্ষোভের মধ্য দিয়ে এই অভিনব প্ল্যাটফর্মটি গড়ে ওঠে। দলটি ‘ককরোচ’ বা তেলাপোকা শব্দটিকে সাধারণ শোষিত মানুষের প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইতিমধ্যে বিশাল অনুসারী ও যুবসমাজকে আকর্ষণ করেছে।
ভারতে নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস এবং সিবিএসই ওএসএম জটিলতাসহ বিভিন্ন জাতীয় পরীক্ষায় নজিরবিহীন অনিয়মের বিরুদ্ধে তারা দেশব্যাপী তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলেছে। ইতিমধ্যে ভারতের খ্যাতনামা সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক এবং জনপ্রিয় দক্ষিণ ভারতীয় অভিনেতা প্রকাশ রাজ এই ককরোচ আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সংহতি জানিয়ে রাজস্থানে রাজপথে নেমেছেন।
ভিডিও বার্তার শেষে অভিজিৎ দিপকে কেন্দ্রীয় সরকারকে চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করলে এই আন্দোলন সমগ্র ভারতে আরও তীব্র হবে এবং তাঁরা খুব শীঘ্রই দিল্লির বুকে লাখো শিক্ষার্থী নিয়ে নতুন করে বড় ধরনের বিক্ষোভ প্রদর্শন করবেন।







