স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আ’লীগ প্রসঙ্গে সংসদে রুমিন ফারহানার প্রশ্ন
 

 

স্থানীয় সরকার নির্বাচন যথাসময়ে, আ’লীগের অংশগ্রহণ নিয়ে ধোঁয়াশা: সংসদে রুমিন ফারহানার প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল

কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে কি না এবং ঝুলে থাকা ইউনিয়ন ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচন কবে নাগাদ অনুষ্ঠিত হবে—জাতীয় সংসদে স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর কাছে তা সরাসরি জানতে চেয়েছেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। জবাবে বিস্তারিত খোলসা না করলেও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, সমস্ত জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ‘যথাসময়েই’ দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

সোমবার (১৫ জুন ২০২৬) বিকেলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় (এবং বর্তমান সরকারের প্রথম) বাজেট অধিবেশনে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটের ছাঁটাই প্রস্তাবের ওপর আলোচনাকালে এই প্রশ্নোত্তর ও নাটকীয়তার সৃষ্টি হয়। এ সময় স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছিলেন।

‘ওনাকে তো আর পাবো না!’ স্পিকারের বাধা ডিঙিয়ে রুমিন ফারহানার প্রশ্ন

সম্পূরক মঞ্জুরি দাবির ওপর ছাঁটাই প্রস্তাবের বক্তব্য দিতে দাঁড়িয়ে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা হঠাৎ স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে যিনি মন্ত্রী আছেন, ওনার কাছে আমার প্রশ্ন—আমাদের স্থানীয় সরকারে যে নির্বাচনগুলো হওয়ার কথা ছিল, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, এই নির্বাচনগুলো কবে হবে?”

এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বাধা দিয়ে বলেন, “মাননীয় সদস্য, এখন তো প্রশ্নোত্তর পর্ব চলছে না (ছাঁটাই প্রস্তাবের আলোচনা চলছে)।” জবাবে রুমিন ফারহানা কিছুটা রসবোধ ও আকুতি মিশিয়ে বলেন, “মাননীয় স্পিকার, ওনাকে (মির্জা ফখরুল) আজ সামনে পেয়েছি, ওনাকে তো আর এভাবে পাবো না! প্রশ্নোত্তর পর্বে তো সুযোগ পাই না; প্রশ্ন জমা দিই, প্রশ্ন তালিকায় আসে না। সম্পূরক প্রশ্নে হাত তুলি, সেখানেও সুযোগ পাই না। তাই এখনই বলি। আবার কখন সুযোগ পাই বলা তো যায় না!” এরপর স্পিকারের নীরব সম্মতিতে তিনি তাঁর মূল বক্তব্য ও প্রশ্ন চালিয়ে যান।

ডিসিদের দিয়ে জেলা শাসন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক: রুমিন ফারহানা

রুমিন ফারহানা সরকারের জেলা প্রশাসন নীতির তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “আমরা জেলাগুলোতে দেখেছি নতুন জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগ করা হয়েছে এবং প্রতিটি জেলা প্রশাসকই দলীয় বা রাজনৈতিক বিবেচনায় মনোনীত। আমরা তো দেশে পূর্ণাঙ্গ গণতন্ত্রের জন্য ২০১৪ থেকে আরম্ভ করে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১০ বছর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে লড়াই করেছি, সংগ্রাম করেছি। কিন্তু বর্তমান সরকার গঠনের পর প্রায় চার মাস পার হয়ে গেলেও স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে কোনো রোডম্যাপ আমরা জানতে পারি নাই।”

তিনি সংবিধানের বাধ্যবাধকতা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আরও বলেন:

“আমাদের সংবিধান অনুযায়ী স্থানীয় পর্যায়ের পুরো শাসনব্যবস্থা স্থানীয় নির্বাচনের মাধ্যমে যারা জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হবেন, তাদের হাতে থাকার কথা। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি, বর্তমান প্রতিটি জেলা আমলা বা জেলা প্রশাসকদের অধীনে শাসিত হচ্ছে। নির্বাচিত প্রতিনিধি ছাড়া ডিসিদের দিয়ে এভাবে শাসন চালানো সরাসরি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সেই কারণেই মন্ত্রীকে আজ জিজ্ঞেস করছি, এই স্থানীয় সরকার নির্বাচন কবে হবে?”

নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নির্বাচন ভাগ্য নিয়ে ধোঁয়াশা

বক্তব্যের শেষ অংশে আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশগ্রহণের আইনি ও রাজনৈতিক জটিলতা নিয়ে মন্ত্রীর স্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করেন রুমিন ফারহানা। তিনি বলেন, “স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারবে কি না—তা নিয়ে চারদিকে ধোঁয়াশা। কেউ বলছেন তারা পারবে, কেউ বলছেন পারবেন না। আবার কেউ বলছেন, নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হবে না, তাই আওয়ামী লীগের যারা ‘ক্লিন ইমেজের’ (স্বচ্ছ ভাবমূর্তির) নেতা আছেন, তারা স্বতন্ত্র হিসেবে অংশ নিতে পারবেন। এই বিষয়গুলো যদি মাননীয় মন্ত্রী আজ সংসদে পরিষ্কার করতেন, তবে আমাদের সংসদ সদস্যদের যেমন বুঝতে সুবিধা হতো, তেমনি তৃণমূলের স্থানীয় রাজনীতিতে যারা যুক্ত আছেন, তাদের বিভ্রান্তিও কাটত।”

যথাসময়েই নির্বাচন: সংক্ষিপ্ত জবাব মির্জা ফখরুলের

পরবর্তীতে ছাঁটাই প্রস্তাবের ওপর পাল্টা আলোচনায় অংশ নিয়ে রুমিন ফারহানার প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত ও কূটনৈতিক জবাব দেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

তিনি বলেন, “এর মধ্যে আমাদের মাননীয় সংসদ সদস্য কয়েকজন স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অবতারণা করেছেন। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট সময় ও প্রক্রিয়ার বিষয়ে আমি তাঁদের এই মুহূর্তে আশ্বস্ত করতে পারি যে, সম্পূর্ণ যথাসময়ে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আমরা সরকারের পক্ষ থেকে যে সিদ্ধান্ত বা নীতিতে একমত হয়েছি, সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই যথাসময়ে সব ধাপে নির্বাচন সম্পন্ন করব।”

তবে দলীয় প্রতীক ছাড়া নির্বাচন হবে কি না কিংবা আওয়ামী লীগের ব্যাকডোর বা স্বতন্ত্র অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে কি না—সে বিষয়ে মন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে সুনির্দিষ্ট কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top