রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার বিচারিক কার্যক্রম মাত্র চার কার্যদিবসে শেষ হয়েছে। অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ, আত্মপক্ষ সমর্থন ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আগামী ৭ জুন রায়ের দিন ধার্য করেছেন আদালত। বিচার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার ক্ষেত্রে এত কম সময়ে বিচার কার্যক্রম শেষ হওয়ার নজির অত্যন্ত বিরল।
ভয়াবহ সেই হত্যাকাণ্ড ও আসামিদের গ্রেপ্তার
ঘটনার শুরু গত ১৯ মে। সেদিন সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রামিসা বাসা থেকে বের হলে প্রতিবেশী সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার কৌশলে তাকে তাদের কক্ষে নিয়ে যান। পল্লবীর সেকশন-১১ এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্টে পরিবারের সঙ্গে বসবাস করতো রামিসা। সে পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। একই ভবনের একটি সাবলেট কক্ষে থাকতেন সোহেল ও স্বপ্না।
মামলার তদন্তে উঠে এসেছে, রামিসাকে বাথরুমে আটকে রেখে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। পরে মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে শরীর থেকে মাথা এবং দুই হাত কাঁধের কাছ থেকে আংশিক বিচ্ছিন্ন করা হয়। মরদেহ খাটের নিচে লুকিয়ে রাখা হয় এবং বাথরুমে একটি বালতিতে রাখা হয় কাটা মাথা। এরপর সোহেল রানা জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যান।
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে পাঠানোর জন্য খোঁজখুঁজি শুরু করেন পরিবারের সদস্যরা। একপর্যায়ে সোহেল ও স্বপ্নার কক্ষের সামনে রামিসার স্যান্ডেল দেখতে পান তার মা। ডাকাডাকি করে কোনো সাড়া না পেয়ে প্রতিবেশীদের নিয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করলে মাথাবিহীন মরদেহ এবং বাথরুমের বালতিতে কাটা মাথা দেখতে পান। এ সময় স্বপ্না আক্তার কক্ষের ভেতরেই উপস্থিত ছিলেন।
ঘটনার দিন রাতেই তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ১৯ মে দিবাগত রাতে (অর্থাৎ ২০ মে) শিশুটির বাবা হান্নান মোল্লা পল্লবী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
আদালতে আসামির স্বীকারোক্তি ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া
পরদিন আদালতে হাজির করার পর সোহেল রানা স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে সম্মতি দেন। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদের আদালত জবানবন্দি গ্রহণ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। একই দিন পৃথক আবেদনের পর সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকেও কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. আশরাফুল হক।
মামলাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং দেশজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিষয়টি গুরুত্ব পায়। একটি জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ ঘটনার বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন এবং সর্বোচ্চ শাস্তির কথা উল্লেখ করেন।
এ ঘটনার পর ২২ মে ঢাকা বার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা দেন যে, বার থেকে কোনো আইনজীবী আসামিদের পক্ষে দাঁড়াবেন না। তবে সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র আসামিদের পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ দেয়।
মাত্র পাঁচ দিনে চার্জশিট ও ছুটির মধ্যেও বিচার
ঘটনার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায়, ২৪ মে তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান দুই আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেন। ওই দিনই আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করে মামলাটি ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর নির্দেশ দেন। ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন অভিযোগপত্রটি গ্রহণ করেন। এরপর ঈদুল আজহার ছুটি শুরু হলেও মামলাটির দ্রুত নিষ্পত্তির স্বার্থে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় বিচারিক কার্যক্রম চালু রাখা হয়।
চার কার্যদিবসের বিচারিক ডায়েরি
অভিযোগ গঠন থেকে যুক্তিতর্ক শেষ হওয়া পর্যন্ত পুরো বিচার কার্যক্রম মাত্র চার কার্যদিবসে যেভাবে সম্পন্ন হয়েছে:
-
১ জুন (প্রথম দিন): আদালত দুই আসামির উপস্থিতিতে অভিযোগ গঠন করেন এবং সাক্ষীদের সমন জারি করেন।
-
২ জুন (দ্বিতীয় দিন): মামলার বাদীসহ ১৬ জন সাক্ষী আদালতে উপস্থিত হয়ে সাক্ষ্য দেন এবং আসামিপক্ষ তাদের জেরা সম্পন্ন করে।
-
৩ জুন (তৃতীয় দিন): আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানিতে প্রধান আসামি সোহেল রানা নিজের দায় স্বীকার করে আদালতের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। অন্যদিকে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন।
-
৪ জুন (চতুর্থ দিন): রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর আজিজুল রহমান দুলু এবং রাষ্ট্রনিযুক্ত আসামিপক্ষের আইনজীবী মূসা কালিমুল্লাহ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। রাষ্ট্রপক্ষ দুই আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দাবি করে। অপরদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী সোহেল রানার জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং স্বপ্না আক্তারের জন্য সাত বছরের সাজা প্রার্থনা করেন। শুনানি শেষে আদালত আগামী ৭ জুন রায়ের দিন ধার্য করেন।
দ্রুত বিচারের যত দৃষ্টান্ত ও আইনজ্ঞদের মত
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, ‘‘বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার ক্ষেত্রে এত কম সময়ে বিচার সম্পন্ন হওয়ার ঘটনা আগে দেখা যায়নি।” তাঁর মতে, শিশু নির্যাতনবিরোধী আইন সংশোধনের পর বিচার শুরু হলে ধারাবাহিকভাবে মামলা পরিচালনার বিধান কার্যকর হওয়ায় এই দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব হয়েছে।
বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর আজিজুল রহমান দুলু ভারতবর্ষের ১৮৮২ সালের নদীয়া জেলার মুলুক চাঁদ চৌকিদারের ৯ বছরের মেয়ে হত্যা মামলার ঐতিহাসিক নজির টানেন, যার বিচার এক দিনে শেষ হয়েছিল বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে ঐতিহাসিক নথি অনুযায়ী, পরবর্তীতে কলকাতা হাইকোর্টে আপিলের পর আলিপুর সেশনস কোর্টে পুনরায় বিচার শুরু হওয়ায় সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি অন্তত দুই মাসের বেশি সময় নিয়েছিল।
আন্তর্জাতিক ও দেশের ভেতরের অন্যান্য দ্রুততম বিচারের নজিরগুলোর মধ্যে রয়েছে:
-
মাগুরা, বাংলাদেশ (আছিয়া মামলা): এই মামলার বিচার ১৪ কার্যদিবসে সম্পন্ন হয়েছিল, যা দেশের ইতিহাসে অন্যতম দ্রুততম সম্পন্ন হওয়া হত্যা মামলা।
-
মহারাষ্ট্র, ভারত (২০১৩): নাগপুরের একটি ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত হত্যা মামলার বিচার ২৩ দিনের মধ্যে শেষ করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।
-
কর্ণাটক, ভারত: এক নারী হত্যা মামলায় মাত্র ১৩ দিনের মধ্যে দোষী সাব্যস্ত করে রায় দেওয়া হয়।
-
বিহার, ভারত (আরারিয়া মামলা): এক দিনে বিচার সম্পন্ন হওয়ার যে জাতীয় রেকর্ড রয়েছে, সেটি মূলত হত্যা মামলা নয়; বরং পকসো (POCSO) আইনের আওতায় সাজা ঘোষণা করা হয়েছিল।
আইনজ্ঞদের মতে, বিচার দ্রুত হওয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই ন্যায়বিচারের মৌলিক শর্ত ও আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করেই এই বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। এখন পুরো দেশবাসীর দৃষ্টি আগামী ৭ জুনের চূড়ান্ত রায়ের দিকে।







